পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৩৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


‘ 8ર * বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী —কখনও আমার নিকট এ সকল কথা মিথ্যা করিয়া বলিবে না, ইছা আমি নিশ্চিত জানি । কিন্তু তাই বলিয়া, আমার হেমচন্দ্র আমাকে বিনাপরাধে ত্যাগ করিলেন, ইহা তাহার মুখে না শুনিয়া কি প্রকারে অন্তঃকরণকে স্থির করিতে পারি ? যদি তাহার নিজ মুখে শুনি যে, তিনি মৃণালিনীকে কুলটা ভাবিয়া ত্যাগ করিলেন, তবে এ প্রাণ বিসর্জন করিতে পারিব । গি। প্রাণবিসর্জন ? সে কি মৃণালিনী ? মৃণালিনী কোন উত্তর করিলেন না। গিরিজায়ার স্কন্ধে বাহুস্থাপন করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন । গিরিজায়াও রোদন করিল। - নবম পরিচ্ছেদ অমৃতে গরল—গরলামুত হেমচন্দ্র আচার্য্যের কথা বিশ্বাস করিয়া মৃণালিনীকে দুশ্চরিত্র বিবেচনা করিয়াছিলেন ; মৃণালিনীর পত্র পাঠ না করিয়া তাহা ছিন্ন-ভিন্ন করিয়াছিলেন, র্তাহার দূতীকে বেত্ৰাঘাত করিতে প্রস্তু ত হইয়াছিলেন। কিন্তু ইহা বলিয়া তিনি মৃণালিনীকে ভালবাসিতেন না, তাহা নহে। মৃণালিনীর জন্য তিনি রাজ্যভ্যাগ করিয়া মথুরাবাসী হইয়াছিলেন । এই মৃণালিনীর জন্য গুরুর প্রতি শরসন্ধান করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন, মুণানিীর জন্য গৌড়ে নিজ ব্রত বিস্তৃত হইয়। ভিখারিণীর তোষামোদ করিয়াছিলেন । আর এখন ? এখন হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যকে শূল দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, "শালিনীকে এই শূলে বিদ্ধ করিব!” কিন্তু তাই বলিয়া কি এখন তাহার স্নেহ একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল ? স্নেহ কি একদিনে ধ্বংস হইয়৷ থাকে ? বহুদিন অবধি পাৰ্ব্বতীয় বারি পৃথিবী-হৃদয়ে বিচরণ করিয়া আপন গতিপথ নিখাত করে, এক দিনের পূর্য্যোত্তাপে কি সে নদী শুকায় ? জলের সে পথ নিখাত হইয়াছে, জল সে পথেই যাইবে ; সে পথ রোধ কর, পুথিবী ভাসিয়া যাইবে । হেমচন্দ্র সেই রাত্রিতে নিজ শয়নকক্ষে, শষ্যোপরি শয়ন করিয়া সেই মুক্ত বাতায়নসন্নিধানে মস্তক রাখিয়া বতায়নপথে দৃষ্টি করিতেছিলেন--তিনি কি নৈশ শোভা দৃষ্টি করিতেছিলেন ? যদি তাহাকে সে সময় কেহ জিজ্ঞাসা করিত যে, রাত্ৰি সজ্যোৎস্না কি অন্ধকার, তাহা তিনি তখন সহস৷ বলিতে পারিতেন না। তাহার হৃদয়মধ্যে যে রজনীর উদয় হইয়াছিল, তিনি কেবল তাঁহাই দেখিতেছিলেন । সে য়াত্রি ত তখনও সজ্যোৎস্না! নহিলে র্তাহার উপাধান আদ্র কেন ? কেবল মেঘোদয় মাত্র । যাহার হৃদয়-আকাশে অন্ধকার বিরাজ করে, সে রোদন করে না । যে কখনও রোদন করে নাই, সে মনুষ্যমধ্যে অধম, তাহাকে কখনও বিশ্বাস করিও না । নিশ্চিত জানিও, সে পৃথিবীর মুখ কখনও ভোগ করে নাই —পরের সুখ কখনও তাঙ্কার সহ হয় না । এমন হইতে পারে যে, কোন আত্মচিত্তজয়ী মহাত্ম বিনা বাষ্পমোচনে গুরুতর মনঃপীড়া সকল সহ করিতেছেন এবং করিয়া থাকেন ; কিন্তু তিনি যদি কম্মিমূকালে এক দিন বিরলে একবিন্দু অশ্রুজলে পৃথিবী সিক্ত না করিয়া থাকেন, তবে তিনি চিত্তবিজয়ী মহাত্মা হইলে হইতে পারেন, কিন্তু আমি বরং চোরের সহিত প্রণয় করিব, তথাপি তাহার সঙ্গে নহে। হেমচন্দ্র রোদন করিতেছিলেন,—াহাকে পাপিষ্ঠ, মনে স্থান দিবার অযোগ্য বলিয়া জানিয়াছিলেন, তাহার জন্য রোদন করিতেছিলেন। মৃণালিনীর কি তিনি দোষ আলোচনা করিতেছিলেন ? তাহা করিতে ছিলেন বটে, কিন্তু কেবল তাহাই নহে । এক একবার মৃণালিনীর প্রেমপরিপূর্ণ মুখমণ্ডল, প্রেমপরিপূর্ণ কথা, প্রেমপরিপূর্ণ কাৰ্য্য সকল মনে করিতেছিলেন। সেই মৃণালিনা কি অবিশ্বাসিনা ? এক দিন মথুরায় হেমচন্দ্র মৃণালিনীর নিকট একখানি লিপি প্রেরণ করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়াছিলেন, উপযুক্ত বাহুক পাইলেন না ; কিন্তু মৃণালিনীকে গবাক্ষপথে দেখিতে পাইলেন । তখন হেমচন্দ্র একটি আম্রফলের উপরে আবগুক কথা লিখিয় মৃণালিনীর ক্রোড় লক্ষ্য করিয়া বাতায়ন-পথে প্রেরণ করিলেন ; আম্র ধরিবার জন্য মৃণালিনী কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া আসাতে আম্র মৃণালিনীর-ক্রোড়ে না পড়িয় তাহার কর্ণে লাগিল, অমনি তদাঘাতে কর্ণ বিলম্বা রত্নকুণ্ডল কর্ণ ছিন্নভিন্ন করিয়া কাটিয়া পড়িল ; কর্ণক্রত রুধিরে মৃণালিনীর গ্রাব! ভাসিয় গেল । মৃণালিনী ক্ৰক্ষেপও করিলেন না । কর্ণে হস্তও দিলেন না ; হাসিয়া আমি তুলিয়া লিপি পাঠ পূৰ্ব্বক তখনই ভৎপৃষ্ঠে প্রত্যুত্তর লিখিয়া আম্র প্রতিপ্রেরণ করিলেন এবং যতক্ষণ হেমচন্দ্র দৃষ্টিপথে রহিলেন, ততক্ষণ বাতায়নে থাকিয়া হাস্তমুখে দেখিতে লাগিলেন। হেমচন্দ্রের তাহা মনে পড়িল । সেই মৃণালিনী কি অবিশ্বাসিনী ? ইহা সম্ভব নহে। আর এক দিন মৃণালিনীকে বৃশ্চিক দংশন করিয়াছিল । তাহার যন্ত্রণায় মৃণালিনী মুমুধুবৎ কাতর হইয়াছিলেন। র্তাহার এক জন পরিচারিক। তাহার উত্তম ঔষধ জানিত ; তৎপ্রয়োগমাত্র যন্ত্রণা একেবারে শীতল হয় ;