পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৩৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88 wo গি । তিনি আপনার নিকট জন্মের শোধ বিদায় লইতে আসিয়াছেন । সরোবর-তীরে দাড়াইয়। আছেন। আপনি আস্থন । এই বলিয়া গিরিজায়া চলিয়া গেল । তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইলেন । গিরিজায় বাপী তীরে, যথায় মৃণালিনী সোপানেপরি বসিয়া ছিলেন, তথায় উপনীত হইল। হেমচন্দ্রও তথায় আসিলেন । গিরিজায়া কহিল, “ঠাকুরাণি ! উঠ । রাজপুত্র আসিয়াছেন।” মৃণালিনী উঠিয়া দাড়াইলেন ; উভয়ে উভয়ের মুখ নিরীক্ষণ করিলেন। মৃণালিনীর দৃষ্টিলোপ হইল ; অশ্রুজলে চক্ষু পুরিয়া গেল। অবলম্বনশাখা ছিন্ন হইলে যেমন শাখাবিলুম্বিনী লতা ভূতলে পড়িয়া যায়, মৃণালিনী সেইরূপ হেমচন্দ্রের পদমূলে পতিত হইলেন। গিরিজায়া অস্তরে গেল । হেমচন্দ্র দশম পরিচ্ছেদ এত দিনের পর হেমচন্দ্র মৃণালিনীকে হস্তে ধরিয়া তুলিলেন । উভয়ে উভয়ের সম্মুখীন হইয় দাড়াইলেন । এত কাল পরে দুই জনের সাক্ষাৎ হইল। যেদিন প্রদোষকালে যমুনার উপকুলে নৈদাঘানিলসন্তাড়িত বকুলমূলে দাড়াইয়া, নীলাম্বুময়ীর চঞ্চল-তরঙ্গুশিরে নক্ষত্ররশ্মির প্রতিবিম্ব নিরীক্ষণ করিতে করিতে উভয়ে উভয়ের নিকট সজলনয়নে বিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার পর এই সাক্ষাং হুইল । নিদাঘের পর বর্ষ। গিয়াছে, বর্ষার পর শরৎ যায়, কিন্তু ইহাদের হৃদয়মধ্যে সে কত দিন গিয়াছে, তাহা কি ঋতুগণনায় গণিত হইতে পারে ? সেই নিশীথসময়ে স্বচ্ছসলিলা-বাপীতীরে, দুই জনে পরস্পর সম্মুখীন হইয়া দাড়াইলেন । চারিদিকে সেই নিবিড় বন, ঘনবিন্যস্ত লতাম্রগ বিশোভা বিশাল বিটপিসকল দৃষ্টিপথ রুদ্ধ করিয়া দাড়াইয়া ছিল ; সম্মুখে নীলনীরদখণ্ডবৎ দীর্ধিক শৈবাল কুমুদকহুলার সহিত বিস্তৃত রহিয়াছিল। মাথার উপরে চন্দ্রনক্ষত্র জলদ সহিত আকাশ আলোকে হাসিতেছিল । চন্দ্রীলোক—আকাশে, বৃক্ষশিরে, লতাপল্লবে, বাপীসোপানে, নীলজলে—সৰ্ব্বত্র হাসিতেছিল। প্রকৃতি ম্পনাহীনা, ধৈর্য্যময়ী । সেই ধৈর্য্যময়ী প্রকৃতির প্রাসাদমধ্যে মৃণালিনী হেমচন্দ্র মুখে মুখে দাড়াইলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী ভাষায় কি শব্দ ছিল না ? তাছাদিগের মনে কি বলিবার কথা ছিল না ? যদি মনে বলিবার কথা ছিল, ভাষায় শব্দ ছিল, তবে কেন ইহার কথা কহে না ? তখন চক্ষুর দেখাতেই মন উন্মত্ত—কথা কহিবে কি প্রকারে ? এ সময় কেবলমাত্র প্রণয়ীর নিকটে অবস্থিতিতে এত সুখ ষে, হৃদয়মধ্যে অন্য মুখের স্থান থাকে না । যে সে সুখভোগ করিতে থাকে, সে আর কথার মুখ বাসনা করে না । সে সময়ে এত কথা বলিবার থাকে ষে, কোন কথা আগে বলিব, তাহ কেহ স্থির করিতে পারে ন! । মনুষ্যভাষায় এমন কোন্‌ শব্দ আছে যে, সে সময়ে প্রযুক্ত হইতে পারে ? তাহারা পরস্পরের মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হেমচন্দ্র মৃণালিনীর সেই প্রেমময় মুখ আবার দেখিলেন-হৃষীকেশ-বাক্যে প্রত্যয় দূর হইতে লাগিল, সেই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে ত পবিত্রতা লেখা আছে। হেমচন্দ্র তাহার লোচন প্রতি চাহিয়া রহিলেন ; সেই অপূৰ্ব্ব আয়তনশালী ইন্দাবর-নিন্দি, অস্তঃকরণের দর্পণ রূপ চক্ষুঃপ্রতি চাহিয়া রহিলেন—তাহা হইতে কেবল প্রেমাশ্র বহিতেছে —সে চক্ষু যাহার,—সে কি অবিশ্বাসিনী ? হেমচন্দ্র প্রথমে কথা কহিলেন । করিলেন, “মৃণালিনি ! কেমন আছ ?” মৃণালিনী উত্তর করিতে পারিলেন না । এখনও তাহার চিত্ত শান্ত হয় নাই ; উত্তরের উপক্রম করিলেন, কিন্তু আবার চক্ষু জলে ভাসিয়া গেল। কণ্ঠ রুদ্ধ হইল। কথা সরিল না । হেমচন্দ্র আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কেন আসিয়াছ ?” মুণালিনী তথাপি উত্তর করিতে পারিলেন না। হেমচন্দ্র তাহার হস্ত ধারণ করিয়া সোপানোপরি বসাইলেন, স্বয়ং নিকটে বসিলেন, মৃণালিনীর যে কিছু চিত্তের স্থিরতা ছিল, এই আদরে তাঁহার লোপ হইল । ক্রমে ক্রমে র্তাহার মস্তক আপনি আসিয়া হেমচঞ্জের স্বন্ধে স্থাপিত হইল, মৃণালিনী তাহা জানিয়াও জানিতে পারিলেন না । মৃণালিনী আবার রোদন করিলেন— তাহার অশ্রজলে হেমচন্দের স্কন্ধ, বক্ষঃ প্লাবিত হইল । এ সংসারে মৃণালিনী যত সুখ অনুভব করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে কোন সুখই এই রোদনের তুল্য নহে। হেমচন্দ্র আবার কথা কছিলেন, “মৃণালিনি । আমি তোমার নিকট গুরুতর অপরাধ করিয়াছি। সে অপরাধ আমার ক্ষমা করিও । আমি তোমার নামে কলঙ্ক রটনা শুনিয়া তাহা বিশ্বাস করিয়াছিলাম। জিজ্ঞাসা