পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৪৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


প। তবে তোমার কাছে প্রকাশ করিলেন, কেন ? ম । তিনি আমার নিকট প্রকাশ করেন নাই । এক দিন গোপনে ব্রাহ্মণীর নিকট প্রকাশ করিতেছিলেন । আমি দৈবাৎ গোপনে শুনিয়াছিলাম । আরও আমি বিধবা বলিয়। পরিচিত। তুমি আমার কথায় প্রত্যয় করিলে লোকে প্রত্যয় করিবে কেন ? তুমি লোকের কাছে নিন্দনীয় না হইয়া কি প্রকারে আমাকে গ্ৰহণ করিতে ? প । আমি সকল লোককে একত্র করিয়া তাহাদিগকে বুঝাইয়া বলিতাম । ম। ভাল, তাহাই হউক—জ্যোতিৰ্ব্বিদের গণনা ? প । আমি গ্রহশান্তি করাইতাম । ভাল, যাহা হইবার, তাহ হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে যদি আমি রত্ন পাইয়াছি, তবে আর তাহ গল হইতে নামাইব না । তুমি আর আমার ঘর ছাড়িয়া যাইতে পারিবে ন} ] মনোরম কহিল, “এ ঘর ছাড়িতে হুইবে । পশুপতি ! আমি যাহ। আজি বলিতে আসিয়াছিলাম, তাহ! বলি, শুন । এ ঘর ছাড় । তোমার রাজ্যলাভের রাশা ছাড় । প্রভুর অহিতচেষ্টা ছাড় । এ দেশ ছাড়িয়া চল, আমরা কাশীধামে যাত্র করি । সেইখানে আমি তোমার চরণসেবা করিয়া জন্ম সার্থক করিব । যে দিন আমাদিগের আয়ুঃশেষ হইবে, একত্রে পরমধামে যাত্রা করিব। যদি ইহা স্বীকার কর আমার ভক্তি আচল থাকিবে । নহিলে—” প। নহিলে কি ? মনোরম তখন উন্নতমুখে সবাষ্পলোচনে, দেবী প্রতিমার সম্মুখে দাড়াইয়া যুক্তকরে, গদগদকণ্ঠে কহিল, “নহিলে দেবীসমক্ষে শপথ করিতেছি, তোমায় অামায় এই সাক্ষাৎ, এ জন্মে আর সাক্ষাৎ হইবে नां ।” পঞ্চপতিও দেবীর সমক্ষে বদ্ধাঞ্জলি হইয়। দাড়াইলেন । বলিলেন,—“মনোরমা—আমিও শপথ করিতেছি, আমার জীবন থাকিতে তুমি আমার বাড়ী ছাড়িয়া যাইতে পারিবে না । মনোরমা, আমি যে পথে পদার্পণ করিয়াছি, সে পথ হইতে ফিরিবার উপায় থাকিলে আমি ফিরিতাম—- তোমাকে লইয়া সৰ্ব্বত্যাগী হইয়া কাশীযাত্রা করিতাম । কিন্তু অনেক দূর গিয়াছি। আর ফিরিবার উপায় নাই—যে গ্রন্থি বাধিয়াছি, তাহ আর খুলিতে মৃণালিনী 8ఫి) পারি না—স্রোতে ভেলা ভাসাইয়। আর ফিরাইতে পারি না । যাহা ঘটিবার, তাহা ঘটিয়াছে। তাই বলিয়া কি আমার পরম মুখে আমি বঞ্চিত হইব ? তুমি আমার স্ত্রী, আমার কপালে যাই থাকুক, আমি তোমাকে গৃহিণী করিব । তুমি ক্ষণেক অপেক্ষা কর— আমি শীঘ্ৰ আসিতেছি ।” এই বলিয়া পশুপতি মন্দির হইতে নিক্রোন্ত হইয়া গেলেন । মনোরমার চিত্তে সংশয় জন্মিল । সে চিন্তিতান্তঃকরণে কিয়ৎক্ষণ মন্দিরমধ্যে দাড়াইয়া রহিল। আর একবার পশুপতির নিকট বিদায় ন৷ লইয়া যাইতে পারিল না। অল্পকাল পরেই পশুপতি ফিরিয়া আসিলেন । বলিলেন, “প্রাণাধিকে । আজ আর তুমি আমাকে ত্যাগ করিয়া যাইভে পরিবে না । আমি সকল দ্বার রুদ্ধ করিয়া আসিয়াছি।” মনোরমী-বিহঙ্গী পিঞ্জরে বদ্ধ হইল । ള്ളജ് চতুর্থ পরিচ্ছেদ যবনদূত—যমদূত বা বেলা প্রহরেকের সময় নগরবাসীর বিস্মিতলোচনে দেখিল, কোন অপরিচিত্ত-জাতীয় সপ্তদশ অশ্বারোহী পুরুষ রাজপথ অতিবাহিত করিয়া রাজভবনাভিমুখে যাইতেছে। তাহাদিগের আকারইঙ্গিত দেখিয়া নবদ্বীপবাসীরা ধন্যবাদ করিতে লাগিল । তাহাদিগের শরীর আয়ত, দীর্ঘ অথচ পুষ্ট ; তাহ+ দিগের বর্ণ তপ্তকাঞ্চনসন্নিভ ; তাহাদিগের মুখমণ্ডল বিস্তৃত, ঘনকৃষ্ণশ্মশ্রীরাজিবিভূষিত ; নয়ন প্রশস্ত, জালাবিশিষ্ট । তাহাদিগের পরিচ্ছদ অনর্থক চাক্‌চিক্যবিবর্জিত ; তাহাদিগের ষোন্ধবেশ ; সৰ্ব্বাঙ্গ প্রহরণজালমণ্ডিত, লোচনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ । আর যে সকল সিন্ধুপারজাত অশ্বপৃষ্ঠে তাহারা আরোহণ করিয়া যাইতেছিল, তাহারাই বা কি মনোহর। পৰ্ব্বতশিলাখণ্ডের ন্যায় বৃহদাকার, বিমার্জিতদেহ, বক্রগ্ৰীৰ, বল্লারোধ-অসহিষ্ণু, তেজোগৰ্ব্বে নৃত্যশীল । আরোহীরা কিব। তচালন-কৌশলী—অবলীলাক্রমে সেই রুদ্ধবায়ু তুল্য তেজঃপ্রখর অশ্ব সকল দমিত করিতেছে। দেখিয়া গৌড়বাসীরা বহুতর প্রশংসা করিল ! সপ্তদশ অশ্বারোহী দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় অধরোষ্ঠ সংশ্লিষ্ট করিয়া নীরবে রাজপুরাভিমুখে চলিল। কৌতুহল বশতঃ কোন নগরবাসী কিছু জিজ্ঞাসা করিলে,