পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


** o দেবী নামে র্তাহার একজন পরিচারিক ছিল । সে ষোধপুর হইতে র্তাহার সঙ্গে আসিয়াছিল ; কিন্তু অনেক দিন দেশছাড়া, এখন অধিক বয়সে আর সে মুসলমানের পুরীর মধ্যে থাকিতে চাহে না । অনেক দিন হইতে সে বিদায় চাহিতেছিল, কিন্তু সে বড় বিশ্বাসী বলিয়া যোধপুরী তাহাকে ছাড়েন নাই। যোধপুরী আজ তাহাকে নিভৃতে লইয়া গিয়া বলিলেন, “তুমি অনেক দিন হইতে যাইতে চাহিতেছ, আজ তোমাকে ছাড়িয়া দিব । কিন্তু তোমাকে অামার একটি কাজ করিতে হইবে । কাজটি বড় শক্ত, বড় পরিশ্রমের কাজ, বড় সাহসের কাজ, আর বড় বিশ্বাসের কাজ । তাহার খরচপত্র দিব, বখশিশ দিব, আর চিরকালের জন্য মুক্তি দিব ! করিবে ?” দেবী বলিল, “আজ্ঞা করুন " যোধপুরী বলিলেন, “রূপনগরের রাজকুমারীর সংবাদ শুনিয়াছ ? তার কাছে যাইতে হইবে, চিঠিপত্র দিব না, যাহা বলিবে, আমার নাম করিয়া বলিবে, আর আমার এই পাঞ্জা দেখাইবে, তিনি বিশ্বাস করিবেন । ঘোড়ায় চড়িতে পার, ঘোড়ায় যাইবে । ঘোড়া কিনিবার খরচ দিতেছি ।” দেবী। কি বলি ে হুইবে ? বেগম । রাজকুমারীকে বলিবে, হিন্দুর কন্যা হইয়া মুসলমানের ঘরে না আসেন । আমরা আসিয়া নিত্য মরণ কামনা করিতেছি । বলিবে যে, তসবীর ভাঙ্গার কথাটা বাদশাহ শুনিয়াছেন । তাকে সাজা দিবার জন্তই আনিতেছেন । প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, রূপনগরওয়ালীকে দিয়া উদিপুরার তামাকু সাজাইবেন! বলিও, বরং বিয খাইও, তথাপি দিল্লীতে আসিও না । আরও বলিও, ভয় নাই, দিল্লীর সিংহাসন টলিতেছে। দক্ষিণে মারহাট্টা মোগলের হাড় ভাঙ্গিয় দিতেছে । রাজপুতের একত্র হইতেছে। জেজিয়ার জালায় সমস্ত রাজপুতান৷ জলিয়া উঠিয়াছে। রাজপুতানায় গোহত্যা হইতেছে । কোন রাজপুত ইহ সহিবে ? সব রাজপুত একত্র হইতেছে । উদয়পুরের রাণা বীরপুরুষ। মোগলতাতারের মধ্যে র্তার মত কেহ নাই । তিনি যদি রাজপুতগণের অধিনায়ক হইয়া অস্ত্র ধারণ করেন—যদি একদিকে শিবজী, আর দিকে রাজসিংহ অস্ত্র ধরেন, তবে দিল্লীর সিংহাসন কয় দিন টিকিবে ? . দেবী । এমন কথা বলিও না, মা ! দিল্লীর ভক্ত তোমার ছেলের জন্ত আছে । আপনার ছেলের সিংহাসন ভাঙ্গিবার পরামর্শ আপনি দিতেছ ? বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী বেগম। অামি এমন ভরসা করি না যে, আমার ছেলে এ তক্তে বসিবে । ষত দিন রাক্ষসী জেব-উন্নিসা আর ডাকিনী উদিপুরী বাচিবে, তত দিন সে ভরসা করি না । একবার সে ভরসা করিয়া রৌশম্বারার কাছে বড় মার খাইয়াছিলাম * আজিও মুখে চোখে সে দাগ-জখমের চিহ্ন আছে। এইটুকু বলিয়া যোধপুরকুমারী একটু কাদিলেন । তার পর বলিলেন, “সে সব কথায় কাজ নাই । তুমি আমার সকল মতলব বুঝিবে না—বুঝিয়াই বা কি হইবে ? যাহা বলি, তাই করিও । রাজকুমারীকে রাজসিংহের শরণ লইতে বলিও । রাজসিংহ রাজকুমারীকে প্রত্যাখ্যান করিবেন না । বলিও, আমি আশীৰ্ব্বাদ করিতেছি যে, তিনি রাণীর মহিষী হউন । মহিষী হইলে যেন প্রতিজ্ঞ করেন যে, উদিপুরী তার তামাকু সাজিবে—রৌশম্বার তাকে পাখার বাতাস করিবে ।” দেবী । এ-ও কি হয় মা ? বেগম । সে কথার বিচার তুমি করিও না । আমি য! বলিলাম, তা পারিবে কি না ? দেবী । আমি সব পারি । বেগম তখন দেবীকে প্রয়োজনীয় অর্থ ও পুরস্কার এবং পাঞ্জা দিয়া বিদায় করিলেন । সপ্তম পরিচ্ছেদ খোদা শাহজাদী গড়েন কেন ? আবার জেব-উন্নিসার বিলাসমন্দিরে মবারক রাত্রিকালে উপস্থিত । এবার মবারক গালিচার উপর জানু পাতিয়া উপবিষ্ট—যুক্তকর, উৰ্দ্ধমুখ । জেব-উন্নিসা সেই রত্নখচিত পালঙ্কে, মুক্তাপ্রবালের ঝালরযুক্ত শয্যায়, জরির কামদার বালিসের উপর হেলিয়, স্ববর্ণের আলবোলায়, রত্নখচিত নলে, তামাকু সেবন করিতেছিল। পাশ্চাত্য মহাত্মগণের কৃপায় তামাকু তখন তারতবর্ষে আসিয়াছে। জেব-উন্নিস বলিতেছেন, “সব ঠিক বলিবে ?” মবারক যুক্তকরে বলিল, “আজ্ঞা করিলেই বলিব " জেব । তুমি দরিয়াকে বিবাহ করিয়াছ ? মবা। যখন স্বদেশে থাকিতাম, তখন করিয়াছিলাম । • কথাটা ঐতিহাসিক। রেশম্বারা যোধপুরীর নাক-মুখ ছিড়িয়া দিয়াছিল।