পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৫৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মৃণালিনী যবনেরা, গোঁড়জয় করিল কি প্রকারে ? যদি এখন এই দেহপতন করিলে এক দিনের তরেও জন্মভূমি দস্থ্যর হাত হইতে মুক্ত হয়, তবে এইক্ষণে তাহ করিতে প্রস্তত আছি । সেই অভিপ্রায়ে রাত্রিতে যুদ্ধের আশায় নগরমধ্যে অগ্রসর হইয়াছিলামকিন্তু যুদ্ধ ত দেখিলাম না। কেবল দেখিলাম যে, এক পক্ষ আক্রমণ করিতেছে—অপর পক্ষ পলাইতেছে।” মাধবাচার্ষ্য কহিলেন, “বৎস! দুঃখিত হইও না । দৈবনির্দেশ কখনও বিফল হইবার নহে । আমি যখন গণনা করিয়াছি যে, যবন, পরাভূত হুইবে, তখন নিশ্চয়ই জানিও, তাহার পরাভূত হইবে। যবনের নবদ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপ ত গৌড় নহে। প্রধান রাজ সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন । কিন্তু গৌড়রাজ্যে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন, তাহার। ত এখনও বিজিত হয়েন নাই । কে জানে যে, সকল রাজা একত্রে প্রাণপণ করিলে যবন বিজিত ন হইবে ?” হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাহার অল্পই সস্তাবনা ।” মাধবাচার্য্য কহিলেন, “জ্যোতিষগণনা মিথ্যা হইবার নহে ; অবগু সফল হইবে । তবে আমার এক ভ্রম হইয়া থাকিবে । পুৰ্ব্বদেশে যবন পরাভূত হইবে—ইহাতে আমরা নবদ্বীপেই যবন জয় করিবার প্রত্যাশা করিয়াছিলাম । কিন্তু গৌড়রাজ্য ত প্রকৃত পূৰ্ব্ব নহে—কামরূপই পূৰ্ব্ব। বোধ হয়, তথায়ই আমাদিগের অাশা ফলবতী হইবে।” হে । কিন্তু এক্ষণে ত যবনের কামরূপ যাওয়ার কোন সস্তাবনা দেখি না । মা । এই যবনের ক্ষণকাল স্থির নহে । গৌড়ে ইহার স্বস্থির হইলেই কামরূপ আক্রমণ করিবে । হে । তাহাও মানিলাম এবং ইহারা যে কামরূপ আক্রমণ করিলে পরাজিত হইবে, তাহাও মানিলাম । কিন্তু তাহা হইলে আমার পিতৃরাজ্য উদ্ধারের কি সদুপায় হইল ? মা। এই ষবনের এ পর্য্যস্ত পুনঃ পুনঃ জয়লাভ করিয়া অজেয় বলিয়া রাজগণমধ্যে প্রতিপন্ন হইয়াছে । ভয়ে কেহ তাঁহাদের বিরোধী হইতে চাহে না । তাহারা একবারমাত্র পরাজিত হইলে তাহাদিগের সে মহিমা আর থাকিবে না । তখন ভারতবর্ষীয় তাবৎ অাৰ্য্যবংশীয় রাজার ধৃতাস্ত্র হুইয়া উঠিবেন। সকলে এক হইয়া অন্ত্র ধারণ করিলে যবনেরা কত দিন তিম্ভিবে ? vరి: (tషి হে । গুরুদেব ! আপনি আশামাত্রের আশ্রয় লইতেছেন ; আমিও তাঁহাই করিলাম ; এক্ষণে আমি কি করিব—আজ্ঞা করুন । মা । আমিও তাহাই চিন্তা করিতেছিলাম । এ নগরমধ্যে তোমার আর অবস্থিতি করা অকৰ্ত্তব্য : কেন না, যবনের তোমার মৃত্যুসাধন সঙ্কল্প করিয়াছে। আমার আজ্ঞা–তুমি অদ্যই এ নগর ভ্যাগ করিবে । হে । কোথায় যাইব ? মা । আমার সঙ্গে কামরূপ চল । হেমচন্দ্র অধোবদন হুইয়া, অপ্রতিভ হইয়া, মৃছ মৃঢ় কহিলেন, “মৃণালিনীকে কোথায় রাখিয়া স্বাক্টবেন ?” মাধবাচার্য্য বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “সে কি ! আমি ভাবিয়াছিলাম যে, তুমি কালিকার কথায় মৃণালিনীকে চিন্তু হইতে দূর করিয়াছিলে!” হেমচন্দ্র পূর্বের ন্যায় মৃদ্ধভাবে বলিলেন, “মৃণালিনী অত্যাজ্য । তিনি আমার পরিণীতা क्ली “ মাধবাচার্য্য চমৎকৃত হইলেন । রুষ্ট হইলেন । ক্ষোভ করিয়া কহিলেন, “আমি ইহার কিছুই জানিলাম না ?” হেমচন্দ্র তখন আদ্যোপান্ত র্তাহার বিবাহের বৃত্তান্ত বিবৃত করিলেন। শুনিয়া মাধবাচার্য্য কিছুক্ষণ মৌনী হইয়া রহিলেন । কহিলেন, “ষে স্ত্রী অসদাচারিণী, সে ত শাস্ত্রানুসারে ত্যাজ্য । মুণালিনীর চরিত্র সম্বন্ধে যে সংশয়, তাহ কালি প্রকাশ করিয়াছি ।” তখন হেমচন্দ্র বোমকেশের বৃত্তান্ত সকল প্রকাশ করিয়া বলিলেন । শুনিয়। মাধবাচার্য্য আননা প্রকাশ করিলেন । কহিলেন;–“বৎস ! বড় প্রীত হইলাম । তোমার প্রিয়তমা এবঞ্চ গুণবতী ভাৰ্য্যাকে তোমার নিকট হইতে ৰিযুক্ত করিয়া তোমাকে অনেক ক্লেশ দিয়াছি। এক্ষণে আশীৰ্ব্বাদ করিতেছি, তোমরা দীর্ঘজীবী হইয়া বহুকাল একত্র ধৰ্ম্মাচারণ কর । যদি তুমি এক্ষণে সন্ত্রীক হইয়াছ, তবে তোমাকে আর আমি আমার সঙ্গে কামরূপ যাইতে অনুরোধ করি না । আমি অগ্ৰে যাইতেছি । যখন সময় বুঝিবেন, তখন তোমার নিকট কামরূপাধিপতি দূত প্রেরণ করিবেন। এক্ষণে তুমি বধূকে লইয়া মথুরায় গিয়া বাস কর—অথবা অন্ত অভিপ্রেত স্থানে বাস করিও।” %