পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৫৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মৃণালিনী শোণিতসিক্ত কৰ্দমে চরণ আর্দ্র হইতে লাগিল । পথের দুই পার্থে গৃহাবলী জনশূন্য-বহু গৃহ ভক্ষ্মীভুত, কোথাও বা তপ্ত অঙ্গার এখনও জ্বলিতেছিল । গৃহাস্তরে দ্বার ভগ্ন—গবাক্ষ ভগ্ন—প্রকোষ্ঠ ভগ্ন—তদুপরি মৃত দেহ । এখনও কোন হতভাগ্য মরণযন্ত্রণায় অমামুষিক কাতরস্বরে শব্দ করিতেছিল । এ সকলের মুল তিনিই । দারুণ লোভের বশবৰ্ত্তী হইয়া তিনি এই রাজধানীকে শ্মশানভূমি করিয়াছেন । পশুপতি মনে মনে স্বীকার করিলেন যে, তিনি প্রাণদণ্ডের যোগ্যপাত্র বটে —কেন মহম্মদ আলিকে কলঙ্কিত করিয়া কারাগার হইতে পলায়ন করিলেন ? ষবন তাহাকে ধৃত করুক—অভিপ্রেত শাস্তি প্রদান করুক—মনে করিলেন, ফিরিয়া বাইবেন । মনে মনে তখন ইষ্ট দেবীকে স্মরণ করিলেন–কিন্তু কি কামনা করিবেন ? কামনার বিষয় আর কিছুই নাই । আকাশ প্রতি চাহিলেন । গগনের নক্ষত্রচন্দ্রগ্রহমণ্ডলীবিভূষিত সহাস্ত পবিত্র শোভ। তাহার চক্ষে সহিল না—তীব্র জ্যোতিঃসম্পাঁড়িতের ন্যায় চক্ষু মুদ্রিত করিলেন । সহসা অনৈসর্গিক ভয় আসিয়া তাহার হৃদয় আচ্ছন্ন করিল—আকারণ ভয়ে তিনি আর পদক্ষেপ করিতে পারিলেন না। সহসা বলহীন হইলেন । বিশ্রাম করিবার জন্য পথিমধ্যে উপবেশন করিতে গিয়া দেখিলেন—এক শবাসনে উপবেশন করিতেছিলেন । শবনিশ্রুত রক্ত তাহার বসনে এবং অঙ্গে লাগিল । তিনি কণ্টকিত-কলেবরে পুনরুত্থান করিলেন । আর দাড়াইলেন না—দ্রুতপদে চলিলেন । সহসা আর এক কথা মনে পড়িল—তাহার নিজবাটী ? তাহা কি যবন-হস্তে রক্ষা পাইয়াছে ? আর সে বাটীতে ষে কুসুমময়ী প্রাণপুত্তলাকে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন, তাহার কি দশা হইয়াছে ? মনোরমার কি দশ৷ হইয়াছে ? তাহার প্রাণাধিকা,ৰ্তাহাকে পাপপথ হইতে পুনঃ পুনঃ নিবারণ করিয়াছিল, সেও বুঝি তাহার পাপসাগরের তরঙ্গে ডুবিয়াছে। এ ষবনসেনাপ্রবাহে সে কুসুমকলিকা না জানি কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে ! পশুপতি উন্মত্তের ন্যায় আপন ভবনাভিমুখে ছুটিলেন ; আপনার ভবনসম্মুখে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, যাহা ভাবিয়াছিলেন, তাহাই ঘটিয়াছে,— জলন্ত পৰ্ব্বতের ন্যায় তাহার উচ্চচুড় অট্টালিকা অগ্নিময় হইয়া জলিতেছে। দৃষ্টিমাত্র হতভাগ্য পশুপতির প্রতীতি হইল যে, যবনেরা তাহার পৌরঞ্জনসহ মনোরমাকে বধ করিয়া গৃহে অগ্নি দিয়া গিয়াছে । মনোরম ষে পলায়ন কৰিয়াছিল, তাহ তিনি কিছু জানিতে পারেন নাই । ΨΣ নিকটে কেহই ছিল না যে, তাহাকে এ সংবাদ প্রদান করে। আপন বিকল চিত্তের সিদ্ধান্তই তিনি গ্রহণ করিলেন। হলাহল কলস পরিপূর্ণ হইল— হৃদয়ের শেষ তন্ত্রী ছিড়িল । তিনি কিয়ৎক্ষণ বিস্ফারিত-নয়নে দহমান অট্টালিকা প্রতি চাহিয়া রহিলেন—মরণোন্মুখ পতঙ্গবৎ অল্পক্ষণ বিকল শরীরে এক স্থানে অবস্থিতি করিলেন-শেষে মহাবেগে সেই অনলতরঙ্গমধ্যে ঝাপ দিলেন। সঙ্গের প্রহরী চমকিত হইয়া রহিল । মহাবেগে পশুপতি জ্বলন্ত দ্বারপথে পুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন । চরণ দগ্ধ হইল—অঙ্গ দগ্ধ হইল—কিন্তু পশুপতি ফিরিলেন না । অগ্নিকুণ্ড অতিক্রম করিয়া আপন শয়নকক্ষে গমন করিলেন—কাহাকেও দেখিলেন না। দগ্ধ শরীরে কক্ষে কক্ষে ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিলেন । র্তাহার আস্তরমধ্যে ষে দুরন্ত অগ্নি । জলিতেছিল—তাহাতে তিনি বাহ দাহষন্ত্রণা অনুভব করিতে পারিলেন না । ণে ক্ষণে গৃহের নুতন নূতন খণ্ড সকল অগ্নি কর্তৃক আক্রান্ত হইতেছিল । আক্রান্ত প্রকোষ্ঠ বিষম শিখা আকাশপথে উত্থাপিত করিয়া ভয়ঙ্কর গর্জন করিতেছিল। ক্ষণে ক্ষণে দগ্ধ গুহাংশ সকল অশনিসম্পাতশব্দে ভূতলে পড়িয়া যাইতেছিল । ধুমে, ধূলিতে, তৎসঙ্গে লক্ষ লক্ষ অগ্নিস্ফুলিঙ্গে আকাশ অদৃষ্ঠ হইতে লাগিল । দাবানলসংবেষ্টিত আরণ্যগজের স্তায় পশুপতি অগ্নিমধ্যে ইতস্ততঃ দাসদাসী, স্বজন ও মনোরমার অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, কাহারও কোন চিহ্ন পাইলেন না—হতাশ হইলেন । তখন দেবীর মন্দির প্রতি তাহার দৃষ্টিপাত হইল । দেখিলেন, দেবী অষ্টভুজার মন্দির অগ্নি কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া জলি তেছে। পশুপতি পতঙ্গবৎ তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন । দেখিলেন, অনলমণ্ডলমধ্যে অদগ্ধা স্বর্ণ-প্রতিমা বিরাজ করিতেছে । পশুপতি উন্মত্তের স্তায় কহিলেন,— *মা ! জগদম্বে ! আরি তোমাকে জগদম্বা বলিব না। আর তোমার পূজা করিব না । তোমাকে প্রণামও করিব না । আশৈশব আমি কায়মনোবাক্যে তোমার সেবা করিলাম—ঐ পদধ্যান ইহজন্মে সার করিয়াছিলাম—এখন মা ! এক দিনের পাপে সৰ্ব্বস্ব হারাইলাম! তবে কি জন্য তোমার পূজা করিয়াছিলাম ? কেনই বা তুমি আমার পাপমতি আপনীত না করিলে?” মন্দিরদহন অগ্নি অধিকতর প্রবল হইয়া গর্জিয়া উঠিল। পশুপতি তথাপি প্রতিমা সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, “ঐ দেখ, ধাতুমূৰ্ত্তি –তুমি