পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৫৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬২ ধাতুমূৰ্ত্তি মাত্র, দেবী নহ—ঐ দেখ, অগ্নি গৰ্জ্জিতেছে । যে পথে আমার প্রাণাধিক গিয়াছে—সেই পথে অগ্নি তোমাকেও প্রেরণ করিবে । কিন্তু আমি অগ্নিকে এ কীৰ্ত্তি রাখিতে দিব না—আমি তোমাকে স্থাপনা করিয়াছিলাম, আমিই তোমাকে বিসর্জন করিব। চল, ইষ্টদেবি ! তোমাকে গঙ্গার জলে বিসর্জন করিব।” এই বলিয়া পশুপতি প্রতিম উত্তোলন আকাজক্ষায় উভয় হস্তে তাহ ধারণ করিলেন । এই সময়ে আবার অগ্নি গর্জিয়া উঠিল। তখন পৰ্ব্বতবিদারানুরূপ প্রবল শব্দ হইল,—দগ্ধ মন্দির, আকাশপথে ধূলিধুমভস্ম সহিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গরাশি প্রেরণ করিয়া চূর্ণ হইয়৷ পড়িয়া গেল ; তন্মধ্যে প্রতিমা সহিত পশুপতির সজীবন সমাধি হইল । পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ অস্তিমকালে পশুপতি স্বয়ং অষ্টভুজার অর্চনা করিতেন বটে —কিন্তু তথাপি র্তাহার নিত্যসেবার জন্য দুর্গাদাস নামে এক জন ব্রাহ্মণ নিযুক্ত ছিলেন । নগর-বিপ্লবের পরদিবস দুর্গাদাস শ্রত হইলেন যে, পশুপতির গুহ ভস্মীভূত হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে। তখন ব্রাহ্মণ অষ্টভুজার মূৰ্ত্তি ভস্ম হইতে উদ্ধার করিয়া আপন গৃহে স্থাপন করিবার সঙ্কল্প করিলেন । যবনের নগর লুঠ করিয়া তৃপ্ত হইলে, বখতিয়ার খিলিজি অনর্থক নগরবাসীদিগের পীড়ন নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন । সুতরাং এক্ষণে সাহস করিয়া বাঙ্গালীর রাজপথে বাহির হইতেছিল । ইহা দেখিয়া দুর্গাদাস অপরাহ্লে অষ্টভুজার উদ্ধায়ে পশুপতির ভবনাভিমুখে যাত্রা করিলেন । পশুপতির ভবনে গমন করিয়া, যথায় দেবীর মন্দির ছিল, সেই প্রদেশে গেলেন । দেখিলেন, অনেক ইষ্টকরাশি স্থানান্তরিত না করিলে, দেবীর প্রতিমা বহিস্কৃত করিতে পারা ষায় না । ইহা দেখিয়া দুর্গাদাস আপন পুত্রকে ডাকিয়া আনিলেন। ইষ্টক সকল অৰ্দ্ধদ্রবীভূত হইয়া পরস্পর লিপ্ত হইয়াছিল—এবং এখন পর্য্যন্ত সন্তপ্ত ছিল । পিতাপুত্রে এক দীধিক হইতে জলবহন করিয়া তপ্ত ইষ্টক সকল শীতল করিলেন এবং বহুকষ্টে তন্মধ্য হইতে অষ্টভুজার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন । ইষ্টকরাশি স্থানান্তরিত হইলে তন্মধ্য হইতে দেবীর প্রতিমা আবিষ্কৃত হইল। কিন্তু প্রতিমার পাদমূলে বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী —এ কি ? সভয়ে পিতাপুত্র নিরীক্ষণ করিলেন ষে, মমুন্যের মৃতদেহ রহিয়াছে । তখন উভয়ে মৃতদেহ উত্তোলন করিয়া দেখিলেন যে, পশুপতির দেহ। বিস্ময়সূচক বাক্যের পর দুর্গাদাস কহিলেন, “ষে প্রকারেই প্রভুর এ দশা হইয়া থাকুক, ব্রাহ্মণের এবঞ্চ প্রতিপালিতের কার্য্য আমাদিগের অবস্ত কর্তব্য ৷ গঙ্গাতীরে এই দেহ লইয়া আমরা প্রভুর সৎকার করি চল ।” - এই বলিয়া দুই জনে প্রভুর দেহ বহন করিয়া গঙ্গাতীরে লইয়া গেলেন । তথায় পুত্রকে শবরক্ষায় নিযুক্ত করিয়া দুর্গাদাস নগরে কাষ্ঠাদি সৎকারের উপযোগী সামগ্রীর অনুসন্ধানে গমন করিলেন এবং যথাসাধ্য সুগন্ধি-কাঠ ও অন্যান্স সামগ্ৰী সংগ্ৰহ করিয়া গঙ্গাতীরে প্রত্যাগমন করিলেন । তখন দুর্গাদাস পুত্রের আমুকুলা যথাশাস্ত্র দাহের পূৰ্ব্বগামী ক্রিয়া সকল সমাপন করিয়া সুগন্ধি-কাঠে চিত রচনা করিলেন এবং তদুপরি পশুপতির মৃতদেহ স্থাপন করিয়া অগ্নি প্রদান করিতে গেলেন । কিন্তু অকস্মাৎ শ্মশানভূমিতে এ কাছার আবির্ভাব হইল ? ব্রাহ্মণদ্বয় বিস্মিতলোচনে দেখিলেন যে, এক মলিনবসন রুক্ষকেশী, আলুলায়িতকুন্তলা, ভস্মধূলিসংসর্গে বিবর্ণ, উন্মাদিনী আসিয়া শ্মশানভূমিতে অবতরণ করিতেছে । রমণী ব্রাহ্মণদিগের নিকট বক্তিনী হইলেন । দুর্গাদাস সভয়চিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কে ?” রমণী কহিলেন, “তোমরা কাহার সৎকার করিতেছ ?” * দুর্গাদাস কহিলেন, “মৃত ধৰ্ম্মাধিকার পশুপতির ।” রমণী কহিলেন, "পশুপতির কি প্রকারে মৃত্যু হুইল ?” দুর্গাদাস কহিলেন, “প্রাতে নগরে জনরব শুনিয়াছিলাম যে, তিনি যবন কর্তৃক কারাবদ্ধ হইয়া কোন সুযোগে রাত্রিকালে পলায়ন করিয়াছিলেন । আদ্য তাহার অট্টালিকা ভস্মসাৎ হইয়াছে দেখিয়া, ভস্মমধ্য হইতে অষ্টভুজার প্রতিমা উদ্ধার-মানসে গিয়াছিলাম । তথায় গিয়া প্রভুর মৃতদেহ পাইলাম।” রমণী কোন উত্তর করিলেন না । গঙ্গাতীরে সৈকতের উপর উপবেশন করিলেন । বহুক্ষণ নীরবে থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা কে ?” দুর্গাদাস কহিলেন, “আমরা ব্রাহ্মণ : ধৰ্ম্মাধিকারের অল্পে প্রতিপালিত হইয়াছিলাম। আপনি কে ?” রমণী কহিলেন, “আমি তাহার পত্নী।” :