পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৬৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তবে কি সেই স্পর্শ ? আমি যে কুমমরাশি রাত্রিদিবা লইয়া আছি, কখন পাতিয়া গুইতেছি, কখন বুকে চাপাইভূেছি—ইহার অপেক্ষ তাহার স্পর্শ কোমল ? তা ত নয়। তবে কি ? এ কাণাকে কে বুঝাইবে, তবে কি ? তোমরা বুঝ না, বুঝাইবে কি ? তোমাদের চক্ষু আছে, রূপ চেন, রূপই বুঝ। আমি জানি, রূপ দ্রষ্টার মানসিক বিকারমাত্ৰ—শব্দও মানসিক বিকার । রূপ রূপবানে নাই । রূপ দর্শকের মনে—নহিলে এক জনকে সকলেই সমান রূপবান দেখে না কেন ? এক জনে সকলেই আসক্ত হয় না কেন ? সেইরূপ শব্দও তোমার । রূপ দর্শকের একটি মনের মুখ মাত্র, শঙ্কও শ্রোতার একটি মনের সুখ মাত্র । স্পর্শও স্পর্শকের মনের সুখ মাত্র । যদি আমার রূপসুখের পথ বন্ধ থাকে, তবে শকা, স্পর্শ, গন্ধ কেন রূপমুখের স্তায় মনোমধ্যে সৰ্ব্বময় না হইবে ? শুষ্কভূমিতে বৃষ্টি পড়িলে কেন না সে উৎপাদিনী হইবে ? শুষ্ককাষ্ঠে অগ্নি সংলগ্ন হইলে কেন না সে জলিবে ? রূপে হউক, শব্দে হউক, স্পর্শে হউক, শূন্ত রমণী হৃদয়ে স্বপুরুষ-সংস্পর্শ হইলে কেন না প্রেম জন্মিবে ? দেখ, অন্ধকারেও ফুল ফুটে, মেঘে ঢাকিলেও চাদ গগনে বিহার করে, জনশূন্ত অরণ্যেও কোকিল ডাকে, যে সাগরগভে মনুষ্য কখনও বাইবে না, সেখানেও রত্ন প্রভাসিত হয়, অন্ধের হৃদয়েও প্রেম জন্মে, আমার নয়ন নিরুদ্ধ বলিয়া হৃদয় কেন প্রস্ফুটিত হইবে না ? হইবে না কেন, কিন্তু সে কেবল আমার যন্ত্রণার জন্ত । বোবার কবিত্ব কেবল তাহার যন্ত্রণার জন্ত, বধিরের সঙ্গীতানুরাগ যদি হয়, কেবল তাহার যন্ত্রণার জন্য, আপনার গীত আপনি শুনিতে পায় না । আমার হৃদয়ে প্রণয়সঞ্চার তেমনি যন্ত্রণার জন্ত । পরের রূপ দেখিব কি—আমি আপনার রূপ কথন আপনি দেখিলাম না। রূপ । রূপ ! আমার কি রূপ । এই ভূমণ্ডলে রজনী নামে ক্ষুদ্র বিন্দু কেমন দেখায় ? আমাকে দেখিলে কখন কি কাহারও আবার ফিরিয়া দেখিতে ইচ্ছা হয় নাই ? এমন নীচাশর ক্ষুদ্র কেহ কি জগতে নাই যে, আমাকে সুন্দর দেখে ? নয়ন না থাকিলে নারী সুন্দরী হয় না—আমার নয়ন নাই—কিন্তু তবে কারিগরে পাথর ক্ষোদিয়া চক্ষুশূন্ত মূৰ্ত্তি গড়ে কেন ? আমি কি কেবল সেইরূপ পাষাণী-মাত্র ? তবে বিধাতা এ পাষাণমধ্যে এ মুখদুঃখসমাকুল রজনী À প্রণয়-লালসাপরবশ হৃদয় কেন পূরিলঃ পাষাণের দুঃখ পাইয়াছি, পাবাণের মুখ পাইলাম না কেন ? এ সংসারে এ তারতম্য কেন ? অনস্ত দুষ্কৃতকারাও চক্ষে দেখে, আমি জন্ম-পূর্বেই কোন দোষ করিয়াছিলাম যে, আমি চক্ষে দেখিতে পাইব না ? এ সংসারে বিধাতা নাই—বিধান নাই, পাপ-পুণ্যের দণ্ডপুরস্কার নাই—অামি মরিব । - আমার এই জীবনে বহু বৎসর গিয়াছে—বস্তু বৎসর আসিতেও পারে । বৎসরে বৎসরে বস্থ দিবস—দিবসে দিবসে বহু দণ্ড—দণ্ডে দণ্ডে বহু মুহূৰ্ত্ত—তাহার মধ্যে এক মুহূৰ্ত্ত জন্য এক পলক জন্য আমার চক্ষু কি ফুটিবে না ? এক মুহূৰ্ত্ত জন্য চক্ষু মেলিতে পারিলে দেখিয়া লই, এই শব্দস্পর্শময় বিশ্বসংসার কি—আমি কি—শচীন্দ্র কি ? চতুর্থ পরিচ্ছেদ আমি প্রত্যহই ফুল লইয়া যাইতাম, ছোট বাবুর কথার শব্দশ্রবণ প্রায় ঘটিত না । কিন্তু কদাচিৎ দুই এক দিন ঘটিত । সে আহিলাদের কথা বলিতে পারি না । আমার বোধ হুইত, বর্ষার জলভরা মেঘ যখন ডাকিয়া বর্ষে, তখন মেঘের বুঝি সেইরূপ আহলাদ হয়, আমারও সেইরূপ ডাকিতে ইচ্ছা করিত । আমি প্রত্যহ মনে করিতাম, আমি ছোট বাবুকে কতকগুলি বাছা ফুলের তোড়া বাধিয়া দিয়া আসিব—কিন্তু তাহা এক দিনও পারিলাম না । একে লজ্জা করিত—আবার মনে ভাবিতাম, ফুল দিলে তিনি দাম দিতে চাহিবেন, কি বলিয়া না লইব ? মনের দুঃখে ঘরে আসিয়া ফুল লইয়া ছোট বাবুকেই গড়িতাম। কি গড়িতাম, তাহা জানি না— কখন দেখি নাই । এদিকে আমার যাতায়াতে একটি অচিন্তনীয় ফল ফলিতেছিল--আমি তাহার কিছুই জানিতাম না ; পিতা-মাতার কথোপকথনে তাহ প্রথম জানিতে পারিলাম । এক দিন সন্ধ্যার পর আমি মালা গাথিতে গাখিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। কি একটা শব্দে নিদ্রা ভাঙ্গিল । জাগরিত হইলে কর্ণে পিতামাতার কথোপকথনের শঙ্ক প্রবেশ করিল । বোধ হয়, প্রদীপ লিভিয়া গিয়া থাকিবে, কেন না, পিতামাতা আমার নিদ্রাভঙ্গ জানিতে পারিলেন, এমত বোধ হইল না । আমিও আমার নাম শুনিয়া কোন সাড়tশৰ করিলাম না। শুনিলাম, মা বলিতেছেম, “তবে এক প্রকার স্থিরই হইয়াছে ?”