পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৭৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Y3 আসার বলি এই জন্য যে, ইঃখই দুঃখের পরিণাম— তাহার পর আর কিছুই নাই ! আমার মৰ্ম্মের দুঃখ আমি এক ভোগ করিলাম, আর কেহ জানিল না— আর কেহ বুঝিল না-দুঃখ-প্রকাশের ভাষা নাই বলিয়। তাহ বলিতে পারিলাম না ; শ্রোতা নাই বলিয়া তাহ শুনাইতে পারিলাম না ; সহৃদয় বোদ্ধা নাই বলিয়া তাহা বুঝাইতে পারিলাম না । একটি শিমুল বৃক্ষ হইতে সহস্র শিমুলবৃক্ষ হইতে পারিবে, কিন্তু তোমার দুঃখে আর কয় জনের দুঃখ হইবে ? পরের অন্তঃকরণের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে, এমন কয় জন পর পৃথিবীতে জন্মিয়াছে ? পৃথিবীতে কে এমন জন্মিয়াছে যে, অন্ধ পুষ্প-নারীর দুঃখ বুঝিবে ? কে এমন জন্মিয়াছে যে, এ ক্ষুদ্র হৃদয়ে, প্রতি কথায়, প্রতি শব্দে, প্রতি বর্ণে, কত সুখ-দুঃখের তরঙ্গ উঠে, তাহা বুঝিতে পারে ? সুখ-দুঃখ ? হুঁ, সুখও আছে। যখন চৈত্রমাসে ফুলের বোঝার সঙ্গে সঙ্গে মৌমাছি ছুটিয়া আমাদের গৃহমধ্যে প্রবেশ করিত, তখন সে শব্দের সঙ্গে আমার কত সুখ উছলিত, কে বুঝিত ? যখন গীত-ব্যবসায়িনীর অট্টালিকা হইতে বাদ্যনিক্কণ সান্ধ্য-সমীরণে কর্ণে আসিত, তখন আমার সুখ কে বুঝিয়াছে ? যখন বামাচরণের আধ আধ কথা ফুটিয়াছিল, জল বলিতে “ত” বলিত, কাপড় বলিতে “খাব” বলিত, রজনী বলিতে “জুপ্রি” বলিত, তখন আমার মনে কত সুখ উছলিত, তাহ কে বুছিয়াছিল ? অামার দুঃখই বা কে বুঝিবে ? অন্ধের রূপোন্মাদ কে বুঝিবে ? না দেখায় যে দুঃখ, তাক কে বুঝিবে ? বুঝিলেও বুঝিতে পারে, কিন্তু দুঃখ যে কখন প্রকাশ করতে পারিলাম না, এ দুঃখ কে বুঝিবে ? পৃথিবীতে যে দুঃখের ভাষা নাই, এ দুঃখ কে বুঝিবে ? ছোট মুখে বড় কথা তোমরা ভালবাস না, ছোট ভাষায় বড় দুঃখ কি প্রকাশ করা যায় ? এমনই দুঃখ যে, আমার যে কি দুঃখ, তাহাতে হৃদয় ধ্বংস হুইলেও, সকলটা আপনি মনে ভাবিয়া আনিতে পারি না । মনুষ্য ভাষাতে তেমন কথা নাই, মনুষ্যের তেমন চিন্তাশক্তি নাই । দুঃখ ভোগ করি—কিন্তু দুঃখটা বুঝিয় উঠতে পারি না। আমার কি দুঃখ ? কি ভাস্থ জানি না, কিন্তু হৃদয় ফাটিয়া যাইতেছে । সৰ্ব্বদা দেখিতে পাইবে, যেন তোমার দেহ শীর্ণ হইতেছে, বল অপহৃত হইতেছে, কিন্তু তোমার শারীরিক রোগ কি, তাহা জানিতে পারিতেছ না । ৰঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী তেমনি অনেক সময়ে দেখিবে যে, দুঃখে তোমার বক্ষঃ বিদীর্ণ হইতেছে, প্রাণ বাহির করিয়া দিয়া, শূন্তমার্গে পাঠাইতে ইচ্ছা করিতেছে—কিন্তু কি দুঃখ, তাহা আপনি বুঝিতে পারিতেছ না । আপনি বুঝিতে পারিতেছ না—পরে বুঝিবে কি ? ইহা কি সামান্ত দুঃখ ? সাধ করিয়া বলি, জীবন অলার ? যে জীবন এমন দুঃখময়, তাহার রক্ষার জন্য এত ভয় পাইতেছিলাম কেন ? আমি কেন ইহা ত্যাগ করি না ? এই ত কলনাদিনী গঙ্গার তরঙ্গ-মধ্যে দাড়াইয়া আছি—আর দুই পা অগ্রসর হইলেই মরিতে পারি ? না মরি কেন ? এ জীবন রাখিয়া কি হইবে ? মরিব ! আমি কেন জন্মিলাম ? কেন অন্ধ হইলাম ? জন্মিলাম ত শচীন্দ্রের যোগ্য হইয়া -জন্মিলাম না কেন ? শচীন্দ্রের যোগ্য না হইলাম, তবে শচীন্দ্রকে ভালবাসিলাম কেন ? ভালবাসিলাম, তবে তাহার কাছে রহিতে পারিলাম না কেন ? কিসের জন্ত শচীন্দ্রকে ভাবিয়া গৃহত্যাগ করিতে হইল ? নিঃসহায় অন্ধ, গঙ্গার চরে মরিতে আসিলাম কেন ? কেন বানের মুখে কুটার মত, সংসারস্রোতে অজ্ঞাভপথে ভাসিয়া চলিলাম ? এ সংসারে অনেক দুঃখী আছে, আমি সৰ্ব্বাপেক্ষ দুঃখী কেন ? এ সকল কাহার খেলা ? দেবতার ? জীবের এত কষ্টে দেবতার কি মুখ ? কষ্ট দিবার জন্য সৃষ্টি করিয়া কি মুখ ? মূৰ্ত্তিমতী নির্দয়তাকে কেন দেবতা বলিব ? কেন নিষ্ঠুরতার পূজা করিব ? মানুষের এত ভয়ানক ঃখ কখন দেবকৃত নহে—তাহ হইলে দেবতা রাক্ষসের অপেক্ষা সংশ্রগুণে নিকৃষ্ট । তবে কি আমার কৰ্ম্মফল ? কোন পাপে আমি জন্মান্ধ ? দুই এক পা করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম— মরিব ! গঙ্গার তরঙ্গরব কাণে বাজিতে লাগিল— বুঝি মরা হইল না—আমি মিষ্টশব্দ বড় ভালবাসি । ন, মরিব । চিবুক ডুবিল ! অধর ডুবিল আর একটুমাত্র। নালিকা ডুবিল ! চক্ষু ডুবিল । আমি ডুবিলাম ! ডুবিলাম, কিন্তু মরিলাম না। কিন্তু এ যন্ত্রণাময় জীবনচরিত আর বলিতে সাধ করে না । আর এক জন বলিবে । - আমি সেই প্রভাতবায়ু তাড়িত গঙ্গাজল-প্রবাহমধ্যে নিমগ্ন হুইয়া তাসিতে ভাসিতে চলিলাম। ক্রমে শ্বাস নিশ্চেষ্ট, চেতন বিনষ্ট হইয়া আসিল ।