পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৮৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তাহাকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিতে পারিলাম না। তিনিও প্রথমে কিছু বলিলেন না। সুতরাং সামাজিক ও রাজকীয় বিষয়ঘটিত নানা কথাবাৰ্ত্ত হইতে লাগিল। দেখিলাম, তিনি কথাবাৰ্ত্তায় অত্যন্ত বিচক্ষণ । তাহার বুদ্ধি মার্জিত, শিক্ষা সম্পূর্ণ এবং চিন্তা বহুদূরগামিনী। কথাবার্তায় একটু অবসর পাইয়। তিনি আমার টেবিলের উপরে স্থিত "সেক্ষপিয়র গেলেরির” পাতা উন্টাইতে লাগিলেন । ততক্ষণ আমি অমরনাথকে দেখিয়া লইতে লাগিলাম। অমরনাথ দেখিতে সুপুরুষ, গৌরবর্ণ, কিঞ্চিৎ খৰ্ব্ব, স্থলও নহে, শীর্ণও নহে ; বড় বড় চক্ষু, কেশগুলি স্বক্ষ, কুঞ্চিত, ষত্ব-রঞ্জিত । বেশভূষার পারিপাট্যের বাড়াবাড়ি নাই, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বটে। র্তাহার কথা কহিবার ভঙ্গী অতি মনোহুর ; কণ্ঠ অতি সুমধুর। দেখিয় বুঝিলাম, লোক অতি সুচতুর। সেক্ষপিয়র গেলেরির পাতা উন্টান শেষ হইলে অমরনাথ নিজ প্রয়োজনের কথা কিছু না বলিয়া ঐ পুস্তকস্থিত চিত্ৰ সকলের সমালোচনা আরম্ভ করিলেন। আমাকে বুঝাইয় দিলেন যে, যাহা বাক্য এবং কাৰ্য্য দ্বারা চিত্রিত হইয়াছে, তাহা চিত্রফলকে চিত্রিত করিতে চেষ্ট পাওয়া ধৃষ্টতার কাজ। সে চিত্র কখনই সম্পূর্ণ হইতে পারে না এবং এ সকল চিত্র সম্পূর্ণ নহে । ডেসডিমনার চিত্র দেখিয়া কছিলেন, “আপনি এই চিত্রে ধৈর্য্য, মাধুর্য, নম্রতা পাইতেছেন, কিন্তু ধৈৰ্য্যের সহিত সে সাহস কৈ ? নম্রভার সঙ্গে সে সতীত্বের অহঙ্কার কৈ ?” জুলিয়েটের মূৰ্ত্তি দেখাইয়া কহিলেন, “এ নবযুবতীর মূৰ্ত্তি বটে, কিন্তু ইহাতে জুলিয়েটের নবযৌবনের অদমনীয় চাঞ্চল্য কৈ ?” অমরনাথ এইরূপে কত বলিতে লাগিলেন। সেক্ষপিয়রের নায়িকাগণ হইতে শকুন্তলা, সীতা, কাদম্বরী, বাসবদত্ত, রুক্মিণী, সত্যভামা প্রভৃতি আসিয়া পড়িল । অমরনাথ একে একে তাহাদিগের চরিত্রের বিশ্লেষণ করিলেন । প্রাচীন সাহিত্যের কথায় ক্রমে প্রাচীন ইতিহাসের কথা আসিয়া পড়িল, তৎপ্রসঙ্গে তাসিতস, প্লুটার্ক, থুকিদিদিস প্রভৃতির অপূর্ব সমালোচনার অবতারণা হইল। প্রাচীন ইতিবৃত্তলেখকদিগের মত লইয়া অমরনাথ কোমতের ত্রৈকালিক উন্নতি-সম্বন্ধীয় মতের সমর্থন করিলেন। কোম্ৎ হইতে র্তাহার সমালোচক মিল ও হক্সলীর কথা আসিল । হক্সলী হইতে ওয়েস ও ডারুইন, হইতে বুকনেয়র, সোপেনহয়র প্রভৃতির সমালোচনা আসিল । অমরনাথ অপূর্ব পাণ্ডিতস্রোত ब्रख्नौ R(t আমার কর্ণরন্ধে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। আমি মুগ্ধ হইয়া আসল কথা ভুলিয়া গেলাম । বেলা গেল দেখিয়া, অমরনাথ বলিলেন, “মহাশয়কে আর বিরক্ত করিব না । যে জন্য আসিয়াছিলাম, তাহা এখনও বলা হয় নাই । রাজচন্দ্র দাস যে আপনাদিগকে ফুল বেচিত, তাহার একটি কন্যা আছে ?” আমি বলিলাম, “আছে বোধ হয় ।” অমরনাথ ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “বোধ হয় নয়, সে আছে । আমি তাহাকে বিবাহ করিব স্থির করিয়াছি।” আমি অবাক হইলাম। অমরনাথ বলিতে লাগিলেন, “আমি রাজচন্দ্রের নিকট এই কথা বলিতেই গিয়াছিলাম । তাহাকে বলা হইয়াছে । এক্ষণে আপনাদিগের সঙ্গে একটা কথা আছে । ষে কথা বলিব, তাহা মহাশয়ের পিতার কাছে বলাই আমার উচিত । কেন না, তিনি কৰ্ত্তা, কিন্তু আমি যাহা বলিব, তাহাতে আপনাদিগের রাগ করিবার কথা । আপনি সৰ্ব্বাপেক্ষ স্থিরস্বভাব এবং ধৰ্ম্মজ্ঞ, এ জন্য আপনাকেই বলিতেছি ।” আমি বলিলাম, “কি কথা মহাশয় ?”• অমর । রজনীর কিছু বিষয় আছে। আমি । সে কি ? সে ষে রাজচন্দ্রের কন্যা । অমর । রাজচন্দ্রের পালিত কস্তা মাত্র । আমি । তবে সে কাহার কন্যা ? কোথায় বিষয় পাইল ? এ কথা আমরা এত দিন কিছু শুনিলাম না কেন ? অমর । আপনারা যে সম্পত্তি ভোগ করিতেছেন, ইহাই রজনীর । রজনী মনোহর দাসের ভ্রাতুষ্কন্যা । একবার, প্রথমে চমকিয়া উঠিলাম। তার পর বুঝিলাম যে, কোন জালসাজ জুয়াচোরের হাতে পড়িয়াছি। প্রকাস্তে উচ্চৈহাস্ত করিয়া বলিলাম, “মহাশয়কে নিষ্কৰ্ম্ম লোক বলিয়া বোধ হইতেছে । আমার অনেক কৰ্ম্ম আছে । এক্ষণে আপনার সঙ্গে রহস্তের আমার অবসর নাই । আপনি গৃহে গমন করুন।” - অমরনাথ বলিলেন, “তবে উকীলের মুখে সংবাদ শুনিবেন ।”