পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৯৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


98 শুনিয়া অনেকে চমৎকৃত হষ্টতে পারেন । তাহাতে আমিও কিছু ধিস্মিত । বিষয় আমার মহে, আমি দখল লইবার কেত নহি । বিষয় রঞ্জনীর, সে দখল না লইলে কে কি করিতে পারে ? পিত্ত্ব রজনী কিছুতেই বিষয়ে দখল লইতে সম্মত নহে। বলে— আঙ্ক নহে—আর দুই দিন যাক,—পশ্চাৎ দখল লষ্টবেন ইভ্যাদি । , দখল না লউক—কিন্তু দরিদ্রকস্তার ঐশ্বর্য্যে এত অনাস্থা কেন, তাহ! আমি অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া কিছুষ্ট স্থির করিতে পারিকেছি না । রাজচন্দ্র এবং রাজচন্দ্রের স্ত্রীও এ বিষয়ে রজনীকে অনুরোধ করিয়াছে, কিন্থ রক্তনী বিষয় সম্প্রতি দখল লষ্টতে চায় না । ইহার মৰ্ম্ম কি ? কাহার জন্য এত পরিশ্রম করিলাম ? ইচ্চার যা হয় একটা চূড়ান্ত স্থির করিবার জন্য আমি রজনীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলাম, রজনীর সঙ্গে আমার বিবাহের কথা উত্থাপিত হওয়া অবধি আমি আর রজনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে বড় যাইতাম না—কেন না, এখন আমাকে দেখিলে রজনী কিছু লজ্জি তা হইত। কিন্তু আজ না গেলে নয় বলিয়া রজনীর কাছে গেলাম । সে বাড়ীতে আমার অবারিতব্ধীর । আমি রজনীর সন্ধানে তাঞ্জার স্বরে গিয়। তাছাকে দেখিতে পাইলাম না । ফিরিয়া আসিতেছি, এমন্ত সময় দেখিতে পাইলাম, রজনী আর একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে উপরে উঠিতেছে। সে স্ত্রীrলাকক দেখিযাই চিনিলাম—অনেক দিন দেখি নাই, কিন্তু দেখিয়াই চিনিলাম যে, ঐ গজেন্দ্রগামিনী ললিতক্সবঙ্গলত । রজনী ইচ্ছাপূৰ্ব্বক জীর্ণবস্ত্র পরিয়াছিল—লজ্জায় সে লবঙ্গলতার সঙ্গে ভাল করিয়া কথা কহিতেছিল না । লবঙ্গলত হাসিতে উছলিয়া পড়িতেছিল—রাগ বা বিদ্বেষের কিছুমাত্র লক্ষণ দেখা গেল না । সে হাসি অনেক দিন শুনি নাই । সে হাসি তেমনই ছিল—পূর্ণিমার সমুদ্রে ক্ষুদ্র তরঙ্গের তুল্য, সপুষ্প বসন্তলতার আন্দোলন তুল্য—তাহা হইতে মুখ ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয় ঝরিয়া পড়িতেছিল । আমি অবাক হইয়া নিম্পন্দশরীরে সশঙ্কচিত্তে এই বিচিত্র-চরিত্রা রমণীর মানসিক শক্তির আলোচনা করিতেছিলাম। ললিতলবঙ্গলতী কিছুতেই টলে না! লবঙ্গলতী মহা ঐশ্বৰ্য্য হইতে দারিদ্র্যে পড়িয়াছে— তবু সেই সুখময় হাসি ; যে রজনী হইতে এই ঘোর বিপদ ঘটিয়াছে, তাহারই গৃহে উঠিতেছে, তাহার সঙ্গে আলাপ করিতেছে, তবু সেই মুখময় হাসি ! ৰঙ্কিমচন্ত্রের গ্রন্থাৰলী আমি সম্মুখে, তবু সেই সুখময় হাসি ! অথচ আমি জানি, লবঙ্গ কোন কথাই ভুলে নাই । আমি সরিয়া পাশ্বের ঘরে গেলাম । লবঙ্গলতা প্রথমে সেই ঘরে প্রবেশ করিল—নিঃশঙ্কচিত্তে আজ্ঞাদায়িনী রাঙ্গরাজেশ্বরীর ন্যায় রজনীকে বলিল,— “রজনি. তুই এ ন আর কোথাও যা! তোর বরের সঙ্গে আমার গোপনে কিছু কথা আছে । ভয় নাই ! তোর বর সন্দর হইলেও আমার বৃদ্ধ স্বামীর অপেক্ষ। সুনীর নহে ।" রজনী অপ্রতিভ হইয়া কি ভাবিতে ভাবিতে সরিয়া গেল । ললিতলবঙ্গলতী ভ্ৰকুট কুটিল করিয়া, সেই মধুর হাসি হাসিয়া, ইন্দ্রাণীর মত আমার সম্মুখে দাড়াইল, একবার বৈ অমরনাথকে কেহ আত্মবিশ্বত দেখে নাই ; আবার আত্মবিস্তুত হইলাম । সেবারেও ললিতলবঙ্গলতী— এবারেও ললিতলবঙ্গলত । লবঙ্গ হাসিয়া বলিল, “আমার মুখপানে চাহিয়া কি দেখিতে ছ ? তোমার অর্জিত ঐশ্বৰ্য্য কাড়িয়া লইতে আসিয়াছি কি না ? মনে করিলে তাহ পারি ” আমি বলিলাম, “তুমি সব পার, কিন্তু ঐটি পার না ; পারিলে কখন রজনীকে বিষয় দিয়া, এখন স্বহস্তে রাধিয়া সতীনকে খাওয়াইবার বন্দোবস্ত করিতে না ।” লবঙ্গ উচ্চগসি হাসিয়া বলিল, “ওটা বুঝি বড় গায় লাগিবে মনে করেছ ? সতীনকে রাধিয়া দিতে হয়, বড় দুঃখের কথা বটে, কিন্তু একটা পাহারাওয়ালাকে ডাকিয় তোমাকে ধরাইয়া দিলে এখনই আবার পাঁচটা রাঁধুনী রাখিতে পারি ” আমি বলিলাম, "বিষয় রজনীর, আমাকে ধরাইয়া দিলে কি হইবে ? যাহার বিষয় সে ভোগ করিতে থাকিবে ।” - লবঙ্গ । তুমি কস্মিনকালে স্ত্রীলোক চিন্‌লে না। যাহাকে ভালবাসে, তাহাকে রক্ষা করিবার জন্য রজনী এখনই বিষয় ছাড়িয়া দিবে। আমি । অর্থাৎ আমার রক্ষার জন্ত বিষয়ুটা তোমাকে ঘুষ দিবে ? লবঙ্গ । তাই । আমি । তবে এত দিন সে যুদ্ধ চাও নাই, আমাদিগের বিবাহ হয় নাই বলিয়া । বিবাহ হইলে কি সে ঘুষ চাহিবে ? লবঙ্গ । তোমার মত ছোটলোকে বুঝিবে কি প্রকারে ? চোরেরা বুঝিতে পারে না যে, পরের দ্রব্য, অস্পৃপ্ত । রজনীর সম্পত্তি রাখিতে পারিলেও আমি রাখিব কেন ?