পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/২৯৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রজনী আমি বলিলাম, “তুমি যদি এমন না হবে, তবে আমার সে মরণকুবুদ্ধি ঘটিবে কেন ? যদি আমার এত অপরাধ মার্জনা করিয়াছ, এত অল্প গ্ৰহ করিয়াছ, তবে অার একটি ভিক্ষা আছে। যাহা জান, তাহী যদি অন্যের কাছে না বলিয়াছ, তবে রজনীর কাছেও বলিও না ।” দপিতা লবঙ্গলতী ভ্ৰাভঙ্গী করিল,—কি সুন্দর জভঙ্গী, বলিল, “আমি কি ঠক ? যে তোমার স্ত্রী হুইবে, তাহার কাছে তোমার নামে ঠকাম করিবার জন্ত তাহার বাড়ীতে আসিয়াছি ?” এই বলিয়া লবঙ্গলতা হাসিল । তাহার হাসির মৰ্ম্ম আমি কিছু কখন বুঝিতে পারি না। লবঙ্গ বিলক্ষণ রাগিয়া উঠিয়াছিল—কিন্তু হাসিতে সব রাগ ভাঙ্গিয়া গেল । যেন জলের উপর হইতে মেঘের ছায়া সরিয়া গেল। তাহার উপর “মেঘমুক্ত চন্দ্রের স্থায় জলিতে লাগিল । আমি লবঙ্গলতার মৰ্ম্ম কখনও বুঝিতে পারিলাম না । হাসিয়া লবঙ্গ বলিল, “তবে আমি রজনীর কাছে शाड़े ?” “যাও !" ললিতলবঙ্গলতা ললিতলবঙ্গলতার মত ফুলিতে দুলিতে চলিল। ক্ষণেক পরে আমাকে ডাকিয়! পাঠাইল । গিয়া দেখিলাম, লবঙ্গলন্ত দাড়াইয়া আছে। রজনী তাহার পায়ে হাত দিয়া কঁাদিতেছে। অামি গেলে, লবঙ্গলতা বলিল, “শুন, তোমার ভবিষ্যৎ ভাৰ্য্যা কি বলিতেছে! তোমার সম্মুখে নহিলে এমন কথা আমি কানে শুনিব না ।” আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি ?” লবঙ্গলতা রজনীকে বলিল, “বল ! তোমাস বর আসিয়াছে—” রজনী সকাতরে অশ্রীপুর্ণলোচনে ললিতলবঙ্গলতার চরণস্পর্শ করিয়া বলিল, “আমার এই ভিক্ষা, আমার যে কিছু সম্পত্তি আছে, এই বাবুর ষত্নে আমার যে সম্পত্তি উদ্ধৃত হইয়াছে, আমি লেখাপড়া করিয়া আপনাকে দান করিব, আপনি গ্রহণ করিবেন না কি ?” আহলাদে আমার সৰ্ব্বাস্তঃকরণ প্লাবিত হইল— আমি রজনীর জন্য যে যত্ন করিয়াছিলাম—ষে ক্লেশ স্বীকার করিয়াছিলাম, তাহ সার্থক বোধ হইল । আমি পূৰ্ব্বেই বুঝিয়াছিলাম, এখন আরও পরিষ্কার বুঝিলাম ষে, রমণীকুলে অন্ধ রজনী অদ্বিতীয় রত্ন। লবঙ্গলতার প্রোজ্জল জ্যোতিও তাঁহার কাছে মান হইল। আমি ইতিপূৰ্ব্বেই রজনীর অন্ধনয়নে רסי ·GI আত্মসমর্পণ করিয়াছিলাম-—আজি তাহার কাছে বিষ্ণু মূল্যে বিক্রীত হইলাম। এই অমূল্য রত্বে আমার অন্ধকার পুরী প্রসারিত করিয়া এ জীবন মুখে কাটাইব । বিধাতা আমার কি সে দিন করিবেন না ? তৃতীয় পরিচ্ছেদ লবঙ্গলতার কথ। আমি মনে করিয়াছিলাম, রজনীর এই বিস্ময়কর কথা শুনিযুী অমরনাথ আt গুনে সেঁকা কলাপাতের কত শুকাইয়া উঠিবে । কৈ, তাহা ত কিছু দেখিলাম না । তাহার মুখ না শুকাইয়। বরং প্রফুল্ল হইল । বিস্মিত, হতবুদ্ধি যা হইবার, তাহা আমি হইলাম। অামি প্রথমে তামাস মনে করিলাম, কিন্তু রজনীর কাতরতা, অশ্রপাত এবং দাঢ্য দেখিয়া অামার নিশ্চয় প্রতীতি জন্মিল যে, রজনী আন্তরিক বলিতেছে । আমি বলিলাম, "রজনী, কায়েতের কুলে তুমিই ধন্য ! তোমার মত কেহ নাই। কিন্তু আমি তোমার দান গ্রহণ করিব না ।” রজনী বলিল,—“না গ্রহণ করেন, আমি ইহা বিলাইয়া দিব ।” - আমি । অমরনাথ বাবুকে ? রজনী। আপনি উহাকে সবিশেষ চিনেন না, আমি দিলেও উনি লইবেন না । লইবার অন্ত লোক আছে । আমি : অমরনাথ বাবু কি বল ? অমর। আমার সঙ্গে কোন কথা হইতেছে না, আমি কি বলিব ? অামি বড় ফাপরে পড়িলাম, রজনী ষে বিষয় ছাড়িয়া দিতেছে, তাঁহাতে বিস্মিত ; আবার অমরনাথ যে বিষয় উদ্ধারের জন্য এত করিয়াছিল, যাহার লোভে রজনীকে বিবাহ করিবার জন্য উদ্যোগ করিতেছে, সে বিষয় হাতছাড়া হইতেছে, দেখিয়াও সে প্রফুল্ল । কাওখানা কি ? আমি অমরনাথকে বলিলাম সে, “যদি স্থানান্তরে ষাও, তবে আমি রজনীর সঙ্গে সকল কথা মুখ ফুটিয়া কই ।” অমরনাথ আমনি সরিয়া গেল । আমি তখন রজনীকে বলিলাম, “সত্য সত্যই কি তুমি বিষয় বিলাইয়া দিবে ?” “সত্য সত্যই । আমি গঙ্গাজল নিয়া শপথ করিয়া বলিতেছি ।”