পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৩০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ विडीब পরিচ্ছেদ অনন্ত মিশ্র অনন্ত মিশ্র চঞ্চলকুমারীর পিতৃকুলপুরোহিত । কল্পানিৰ্ব্বিশেষে চঞ্চলকুমারীকে ভালবাসিতেন । তিনি মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত । সকলে তাহাকে ভক্তি করিত। চঞ্চলের নাম করিয়! তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইবামাত্র তিনি অন্তঃপুরে আসিলেন—কুলপুরোহিতের অবারিতদ্বার। পথিমধ্যে নিৰ্ম্মল তাহাকে গ্রেপ্তার করিল এবং সকল কথা বুঝাইয়া দিয়া ছাড়িয়া দিল । বিভূতিচন্দনবিভূষিত, প্রশস্তললাট, দীর্ঘকায়, রুদ্রাক্ষশোভিত, হাস্তবদন সেই ব্রাহ্মণ চঞ্চলকুমারীর কাছে আসিয়া দাড়াইলেন । নিৰ্ম্মল দেখিয়াছিল যে, চঞ্চল কঁাদিতেছে, কিন্তু আর কাহারও কাছে চঞ্চল কাদিবার মেয়ে নহে । গুরুদেব দেখিলেন, চঞ্চল স্থিরমূৰ্ত্তি। বলিলেন, “ম লক্ষ্মী—আমাকে স্মরণ করিয়াছ কেন ?” চঞ্চল । আমাকে বঁাচাইবার জন্ত । আর কেহই নাই যে, অামায় বাচায় । অনন্ত মিশ্ৰ হাসিয়া বলিলেন, “বুঝেছি, রুক্মিণীর বিয়ে, তাই পুরোহিত বুড়াকেই দ্বারকায় যেতে হবে । তা দেখ দেখি মা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কিছু আছে "ৰ না—পথ-খরচটা জুটলেই আমি উদয়পুরে যাত্রা করিব ” চঞ্চল একটি জরির থলি বাহির করিয়া দিল । তাহাতে আসরফি ভরা । পুরোহিত পাচটি আসরফি স্নইয়া অবশিষ্ট ফিরাইয়া দিলেন—বলিলেন, “পথে অল্পই থাইতে হইবে—আসরফি খাইতে পারিব না । একটি কথা বলি, পারবে কি ?” চঞ্চল বলিলেন, “আমাকে আগুনে ঝাপ দিতে বলিলেও আমি এ বিপদ হইতে উদ্ধার হইবার জন্য তাও পারি। কি আজ্ঞা করুন ।” মিশ্র। রাণ রাজসিংহকে একখানি পত্র লিখিয়া দিতে পারিবে ? চঞ্চল ভাবিল । বলিল, “আমি বালিকা— পুরস্ত্রী, তাহার কাছে অপরিচিত—কি প্রকারে পত্র লিখি ? কিন্তু আমি তাহার কাছে যে ভিক্ষ চাহিতেছি, তাহাতে লজ্জারই বা স্থান কই ? লিখিব।” / মিশ্র। আমি লিখাইয়া দিব, না আপনি লিখিবে ? চঞ্চল । আপনি বলিয়া দিন । સ્વ: নিৰ্ম্মল সেখানে আসিয়া দাড়াইয়াছিল । সে বলিল, “ত হইবে না। এ বামুনে বুদ্ধির কাজ নয়— এ মেয়েলি বুদ্ধির কাজ । আমরা পত্র লিখিব । আপনি প্রস্তুত হইয়া আসুন ।” মিশ্র ঠাকুর চলিয়া গেলেন, কিন্তু গৃহে গেলেন না ; রাজা বিক্রমসিংহের নিকট দর্শন দিলেন । বলিলেন, “আমি দেশপর্য্যটনে গমন করিব, মহারাজকে আশীৰ্ব্বাদ করিতে আসিয়াছি ।” কি জন্য কোথায় যাইবেন, রাজা তাহা জানিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন, কিন্তু ব্ৰাহ্মণ তাহা কিছুই প্রকাশ করিয়া বলিলেন না । তথাপি তিনি যে উদয়পুর পর্য্যন্ত যাইবেন, তাহা স্বীকার করিলেন এবং রাণার নিকট পরিচিত হইবার জন্য একখানি লিপির জন্য প্রার্থনা করিলেন । রাজাও পত্র দিলেন । অনন্ত মিশ্র রাজার নিকট হইতে পত্র সংগ্ৰহ করিয়া চঞ্চলকুমারীর নিকট পুনরাগমন করিলেন । ততক্ষণ চঞ্চল ও নিৰ্ম্মল দুই জনে দুই বুদ্ধি একত্র করিয়া একখানি পত্র সমাপন করিয়াছিল । পত্র শেষ করিয়া রাজনন্দিনী একটি কোটা হইতে অপূৰ্ব্ব শোভাবিশিষ্ট মুকুতা-বলয় বাহির করিয়া ব্রাহ্মণের হস্তে দিয়া বলিলেন, “রাণী পত্র পড়িলে আমার প্রতিনিধিস্বরূপ আপনি এই রাখি বাধিয়া দিবেন। রাজপুতকুলের যিনি চুড়া, তিনি কখন রাজপুতকন্যার প্রেরিত রাখি অগ্রাহা করিবেন না ।” মিশ্র ঠাকুর স্বীকৃত হইলেন । রাজকুমারী র্তাহাকে প্রণাম করিয়া বিদায় করিলেন । তৃতীয় পরিচ্ছেদ মিশ্র ঠাকুরের নারায়ণস্মরণ পরিধেয় বস্ত্র, ছত্র, যষ্টি, চন্দনকাষ্ঠ প্রভৃতি নিতান্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং একমাত্র ভূত্য সঙ্গে লইয়া, অনন্ত মিশ্র গৃহিণীর নিকট হইতে বিদায় লইয়। উদয়পুর যাত্রা করিলেন। গৃহিণী বড় পীড়াপীড়ি । করিয়া ধরিল, “কেন যাইবে ?” মিশ্র ঠাকুর বলিলেন, “রাণার কাছে কিছু বৃত্তি পাইব ।” গৃহিণী তৎক্ষণাৎ শাস্ত হইলেন ; বিরহ-যন্ত্রণ আর র্তাহাকে দাহ । করিতে পারিল না, অর্থলাভের আশাস্বরূপ শীতলবারি-প্রবাহে সে প্রচণ্ড বিচ্ছেদবহ্নি বার কত ফোলফেঁাস করিয়া নিবিয়া গেল ; মিশ্র ঠাকুর ভূত্য সঙ্গে যাত্রা করিলেন। তিনি মনে করিলে অনেক লোক