পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৩১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૭ , সঙ্গে লইতে পারিতেন । কিন্তু অধিক লোক থাকিলে কাণাকাণি হয়, এ জন্য লইলেন না। পথ অতি দুর্গম—বিশেষ পাৰ্ব্বত্য পথ বন্ধুর এবং অনেক স্থানে আশ্রয়শূন্ত। একাহারী ব্রাহ্মণ যে দিন যেখানে অtশ্রয় পাইতেন, সে দিন সেখানে আতিথ্য-স্বীকার করিতেন ; দিনমানে পথ অতিবাহন করিতেন। পথে কিছু দস্ল্যভয় ছিল—ব্রাহ্মণের নিকট রত্নবলয় আছে বলিয়া ব্রাহ্মণ কদাপি একাকী পথ চলিতেন না। সঙ্গী জুটলে চলিতেন । সঙ্গিছাড়া হইলেই আশ্রয় খুজিতেন। এক দিন রাত্রে এক দেবালয়ে আতিথ্য স্বীকার করিয়া পরদিন প্রভাতে গমনকালে র্তাহাকে সঙ্গী খুজিতে হইল না। চারি জন বণিকৃ ঐ দেবালয়ের অতিথিশালায় শয়ন করিয়াছিল, প্রভাতে উঠিয়া তাহারাও পাৰ্ব্বত্যপথে আরোহণ করিল। ব্রাহ্মণকে দেখিয়া উহার জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কোথ। যাইবে ?” ব্রাহ্মণ বলিলেন, “আমি উদয়পুর যাইব ।” বণিকেরা বলিল, “আমরাও উদয়পুর যাইব। ভাল হইয়াছে, একত্রে যাই চলুন !” ব্রাহ্মণ আনন্দিত হইয়া তাহাদিগের সঙ্গী হইলেন । জিজ্ঞাসা করিলেন, “উদয়পুর আর কতদূর ?” বণিকেরা বলিল, “নিকট, আজ সন্ধ্যার মধ্যে উদয়পুর পৌঁছিতে পারিব। এ সকল স্থান রাণার রাজ্য ।” এইরূপ কথোপকথন করিতে করিতে তাহারা চলিতেছিল । পাৰ্ব্বত্যপথ অতিশয় দুরারোহণীয় এবং ছরবরো, সচরাচর বসতিশূন্ত । কিন্তু এই দুর্গম পথ প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছিল—এখন সমতল ভূমিতে অবরোহণ করিতে হইবে । পথিকের এক অনিৰ্ব্বচনীয় শোভাময় অধিক্যতায় প্রবেশ করিল। দুই পাশ্বে অনতি উচ্চ পৰ্ব্বতদ্বয়, হরিতরক্ষাদিশোভিত হইয়া আকাশে মাথা তুলিয়াছে, উভয়ের মধ্যে কলনদিনী ক্ষুদ্র প্রবাহিণী নীলকাচ প্রতিম সফেন জল-প্রবাহে উপলদল ধৌত করিয়া বনাসের অভিমুখে চলিতেছে। তটিনীর ধার দিয়া মনুষ্যগম্য পথের রেখা পড়িয়াছে। সেখানে নামিলে আর কোন দিক্‌ হইতে কেহ পথিককে দেখিতে পায় না, কেবল পৰ্ব্বতদ্বয়ের উপর হইতে দেখা যায় । সেই নিভৃতস্থানে অবরোহণ করিয়া, এক জন ৰণিক্‌ ব্ৰাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার ঠাই ট্রাক-কড়ি কি আছে ?” ব্ৰাহ্মণ প্রশ্ন শুনিয়া চমকিত ও ভীত হইলেন । ভাবিলেন, বুঝি এখানে দত্মার বিশেষ ভয়, তাই সতর্ক করিবার জন্য বণিকের জিজ্ঞাসা করিতেছে। দুৰ্ব্বলের বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী অবলম্বন মিথ্যা কথা। ব্রাহ্মণ বলিলেন, “আমি ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ, আমার কাছে কি থাকিবে ?” - বণিক্‌ বলিল, “যাহা কিছু থাকে, অামাদের নিকট দাও নহিলে এখানে রাখিতে পারিবে না ।” ব্রাহ্মণ ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। একবার মনে করিলেন, রত্ন বলয় রক্ষার্থ বণিকৃদিগকে দিই। আবার ভাবিলেন, ইহার অপরিচিত, ইহাদিগকেই বা বিশ্বাস কি ? এই ভাবিয়া ইতস্ততঃ করিয়া ব্রাহ্মণ পূৰ্ব্ববৎ বলিলেন, “আমি ভিক্ষুক, আমার কাছে কি থাকিবে ?” বিপৎকালে যে ইতস্ততঃ করে সেই মারা যায় । ব্রাহ্মণকে ইতস্ততঃ করিতে দেখিয়া ছদ্মবেশী বণিকেরা বুঝিল যে, অবশু ব্রাহ্মণের কাছে বিশেষ কিছু আছে। এক জন তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণের ঘাড় ধরিয়া ফেলিয়া দিয়া তাহার বুকে ঠাটু দিয়া বসিল—এবং তাহার মুখে হাত দিয়া চাপিয়া ধরিল। মিশ্র ঠাকুরের ভৃত্যটি তৎক্ষণাং কোনূ দিকে পলায়ন করিল, কেহ দেখিতে পাইল না। মিশ্র ঠাকুর বাঙ নিস্পত্তি করিতে না পারিয়া নারায়ণ-স্মরণ করিতে লাগিলেন । তার এক জন তাহার গাটরি কাড়িয়া লইয়া পুলিয়া দেখিতে লাগিল । তাহার ভিতর হষ্টতে চঞ্চলকুমারীপ্রেরিত বলয়, দুইখানি পত্র এবং আসরফি পাওয়া গেল। দস্থ্য তাহা হস্তগত করিয়া সঙ্গীকে বলিল, “আর ব্ৰহ্ম-হত্যা করিয়া কাজ নাই। উহার যাহা ছিল, তাহা পাইয়াছি । এখন উহাকে ছাড়িয়া দে ” আর এক জন দস্থ্য বলিল, “ছাড়িয়া দেওয়া হইবে না, ব্রাহ্মণ তাহা হইলে এখনই একটা গোলযোগ করিবে । আজকাল রাণ রাজসিংহের বড় দৌরাত্ম্য —র্তাহার শাসনে ধীরপুরুষে আর অন্ন করিয়া খাষ্টতে পারে না। উহাকে এক গাছে বাধিয়া রাখিয়া যাই ।” এই বলিয়া দস্যগণ মিশ্র ঠাকুরের হস্ত, পদ এবং মুখ তাহার পরিধেয় বস্ত্রে দৃঢ়তর বাধিয়া পৰ্ব্বতের সামুদেশস্থিত একটি ক্ষুদ্র বৃক্ষের কাণ্ডের সহিত বাধিল । পরে চঞ্চলকুমারীদন্তু রত্নবলয় ও পত্র প্রভৃতি লইয় ক্ষুদ্র নদীর তীরবর্তী পথ অবলম্বন করিয়া পৰ্ব্বতান্তরালে অদৃশ্ব হইল। সেই সময়ে পৰ্ব্বতের উপরে দাড়াইয়া এক জন অশ্বারোহী তাহাদিগকে দেখিল । তাহারা অশ্বারোহীকে দেখিতে পাইল না, পলায়নে ব্যস্ত । দক্ষ্যগণ পাৰ্ব্বতীয় প্রবাহিণীর তটবৰ্ত্তী বনমধ্যে প্রবেশ করিয়া অতি দুর্গম ও মনুষ্যসমাগমশুষ্ঠ পথে চলিল। এইরূপ কিছুদূর গিয়া এক নিভৃত গুহামধ্যে প্রবেশ করিল। গুহার ভিতর খাদ্যদ্রব্য, শষ্যা,