পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৩২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ পাকের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সকল প্রস্তুত ছিল । দেখিয়া বোধ হয়, দস্যগণ কখন কখন এই গুহামধ্যে লুকাইয়া বাস করে। এমন কি, কলসীপূর্ণ জল পৰ্য্যন্ত ছিল । দস্যগণ সেইখানে উপস্থিত হইয়৷ তামাকু সাজিয়া খাইতে লাগিল, এবং এক জন পাকের উদূযোগ করিতে লাগিল ৷ এক জন বলিল, “মাণিক লাল, রমুই পরে হইবে । প্রথমে মালের কি ব্যবস্থা, হইবে, তাহার মীমাংসা করা যাউক ৷” মাণিকলাল বলিল, “মালের কথাই আগে झडेक ". তখন আসরফি কয়টি কাটিয়া চারি ভাগ করিল। এক এক জন এক এক ভাগ লইল । রত্নবলয় বিক্রয় ন হইলে ভাগ হইতে পারে না—তাহা সম্প্রতি অবিভক্ত রহিল। পত্র দুইখানি কি করা যাইবে, তাহার মামাংসা হইতে লাগিল । দলপতি বলিলেন, "কাগজে আর কি হইবে—উহা পোড়াইয়। ফেল ” এই বলিয়৷ পত্র দুইখানি সে মাণিকলালকে অগ্নিদেবকে সমর্পণ করিবার জন্ত দিল । মাণিকলাল কিছু কিছু লিখিতে পড়িতে জানিত । সে পত্র দুইখানি আদ্যোপাস্ত পড়িয়া আনন্দিত হইল । বলিল, “এ পর নষ্ট করা হইবে না । ইহাতে রোজগার হইতে পারে ” “কি ? কি ?” বলিয়। আর তিন জন গোলযোগ করিয়া উঠিল । মাণিকলাল তখন চঞ্চলকুমারীর পত্রের বৃত্তাপ্ত তাহাদিগকে সবিস্তারে বুঝাইয়া দিল । শুনিয়া চোরের বড় আনন্দিত হইল । মাণিকলাল বলিল, “দেখ, এই পত্র রাণাকে দিলে কিছু পুরস্কার পাইব ।” দলপতি বলিল, “নিৰ্ব্বোধ ! রাণ! যখন জিজ্ঞাসা করিবে, তোমরা এ পত্র কোথায় পাইলে, তখন কি উত্তর দিবে ? তখন কি বলিবে যে, আমরা রাহাঙ্গানি করিয়া পাইয়াছি ? রাণার কাছে পুরস্কারের মধ্যে প্রাণদণ্ড হইবে । তাহা নহে—এ পত্র লইয়া গিয়া বাদশাহকে দিব—বাদশাহের কাছে এরূপ সন্ধান দিতে পারিলে অনেক পুরস্কার পাওয়া যায়, আমি জানি। আর ইহাতে—” দলপতি কথা সমাপ্ত করিতে অবকাশ পাইলেন না। কথা মুখে থাকিতে থাকিতে র্তাহার মস্তক স্কন্ধ হইতে বিচ্যুত হইয়া ভূতলে পড়িল । -* চতুর্থ পরিচ্ছেদ মাণিকলাল অশ্বারোহী পৰ্ব্বতের উপর হইতে দেখিল, চারি জনে এক জনকে বাধিয়া রাখিয়া চলিয়া গেল । আগে কি হইয়াছে, তাহা সে দেখে নাই, তখন সে পৌছে নাই । অশ্বারোহী নিঃশব্দে লক্ষ্য করিতে লাগিল, উহার কোন পথে যায় তাহারা যখন নদীর বঁাক ফিরিয়া পৰ্ব্বতান্তরালে অদৃষ্ঠ হইল, তখন অশ্বারোহী অশ্ব হইতে নামিল। পরে অশ্বের গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল, “বিজয় ! এখানে থাকিও - আমি আসিতেছি—কোন শব্দ করিও ন} * অশ্ব স্থির হইয় দাড়াইয়া রহিল ; তাহার আরোহী পাদচারে অতি দ্রুতবেগে পৰ্ব্বত হইতে অবতরণ করিলেন । পৰ্ব্বত যে বড় উচ্চ নহে, তাহ পূর্বেই বলা হইয়াছে। অশ্বারোহী পদব্রজে মিশ্র ঠাকুরের কাছে আসিয়া র্তাহাকে বন্ধন হইতে মুক্ত করিলেন । মুক্ত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হইয়াছে, অল্প কথায় বলুন !” মিশ্র বলিলেন, "চারি জনের সঙ্গে আমি একত্র আসিতেছিলাম। তাহীদের চিনি না—পথের আলাপ ; তাহারা বলে, আমরা বণিক, এইখানে আসিয়া তাহারা মারিয়া ধরিয়া আমার ষাহ কিছু ছিল, কাড়িয়া লইয়া গিয়াছে।” প্রশ্ন কর্তা জিজ্ঞাসা করিলেন, গিয়াছে ?” ব্রাহ্মণ বলিল, “একগাছি মুক্তার বাল" কয়টি আসরফি, দুইখানি পত্র।" প্রশ্নকৰ্ত্ত বলিলেন, “আপনি এইখানে থাকুন, উহার কোন দিকে গেল, আমি দেখিয়া আসি ” ব্রাহ্মণ বলিলেন, “আপনি যাইবেন, কি প্রকারে ? তাহারা চারি জন, আপনি এক " আগস্তুক বলিল, “দেখিতেছেন না, আমি রাজপুত সৈনিক ৷” অনন্ত মিশ্র দেখিলেন, এই ব্যক্তি যুদ্ধব্যবসায়ী বটে ! তাহার কোমরে তরবারি এবং পিস্তল এবং হস্তে বর্শা। তিনি ভয়ে আর কথা কহিলেন না । রাজপুত যে পথে দস্থ্যগণকে যাইতে দেখিয়াছিলেন, সেই পথে অতি সাবধানে তাহাদিগের অমুসরণ করিতে লাগিলেন । কিন্তু বনমধ্যে আসিয়া আর পথ পাইলেন না, অথবা দসু্যদিগের কোন নিদর্শন পাইলেন না । তখন রাজপুত আবার পর্বতের শিখরদেশে আরোহণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ “কি কি লইয়।