পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৩৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ساله : " দৃষ্টি করিতে করিতে দেখিলেন যে, দুরে বনের ভিতর প্রচ্ছন্ন থাকিয় চারি জনে যাইতেছে । সেইখানে কিছুক্ষণ অবস্থিতি করিয়া দেখিতে লাগিলেন, ইহার কোথায় যায় ; দেখিলেন, কিছু পরে উহার একটা পাহাড়ের তলদেশে গেল, তাহার পর উহাদের আর দেখা গেল না। তখন রাজপুত সিদ্ধাস্ত করিলেন যে, উহারা হয় ঐখানে বসিয়া বিশ্রাম করিতেছে-বৃক্ষদির জন্য দেখা যাইতেছে না ; নয়, ঐ পৰ্ব্বততলে গুহা আছে, তাহার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে । রাজপুত বৃক্ষাদি চিহ্ন দ্বারা সেই স্থানে যাইবার পথ বিলক্ষণ করিয়া নিরূপণ করিলেন । পরে অবতরণ করিয়া বনমধ্যে প্রবেশ পূৰ্ব্বক সেই সকল চিহ্নলক্ষিত পথে চলিলেন । এইরূপে বিবিধ কৌশলে তিনি পূৰ্ব্বলক্ষিত স্থানে আসিয়া দেখিলেন, পৰ্ব্বততলে একটি গুহা আছে। গুহামধ্যে মনুষ্যের কথাবার্তা শুনিতে পাইলেন । এই পৰ্য্যন্ত আসিয়া রাজপুত কিছু ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন, উহার চারি জন—তিনি একা, এক্ষণে গুহামধ্যে প্রবেশ করা উচিত কি না ? যদি গুহাদ্বার রোধ করিয়া উহার চারি জনে তাহার সঙ্গে সংগ্রাম করে, তবে তাহার বাচিবার সম্ভাবনা নাই । কিন্তু এ কথা রাজপুতের মনে বড় অধিকক্ষণ স্থান পাইল না-মৃত্যুভয় আবার ভয় কি ? মৃত্যুভয়ে রাজপুত কোন কাৰ্য্য হইতে বিরত হয় না। কিন্তু দ্বিতীয় কথা এই যে, তিনি গুহামধ্যে প্রবেশ করিলেই র্তাহার হস্তে দুই এক জন অবশু মরিবে ; যদি উহারা সেই দস্থ্যদল না হয়, তবে নিরপরাধের হত্যা হইবে । এই ভাবিয়া রাজপুত সন্দেহ-ভঞ্জনার্থ অতি ধীরে ধীরে গুহাদ্বারের নিকট আসিয়া দাড়াইয়া অভ্যন্তরস্থ ব্যক্তিগণের কথাবাৰ্ত্তা কর্ণপাত করিয়া শুনিতে লাগিলেন । দস্থ্যর তখন অপহৃত সম্পত্তি বিভাগের কথা কহিতেছিল। শুনিয়া রাজপুতের নিশ্চয় প্রতীতি হইল যে, উহারা দম্য বটে। রাজপুত তখন গুহামধ্যে প্রবেশ করাই স্থির করিলেন । ধীরে ধীরে বর্শা বনমধ্যে লুকাইলেন। পরে অসি নিস্কোষিত করিয়া দক্ষিণ হস্তে দৃঢ়মুষ্টিতে ধারণ করিলেন। বাম হস্তে পিস্তল লইলেন। দসু্যরা ষখন চঞ্চলকুমারীর পত্র পাইয়া অর্থলাভের আকাঙ্ক্ষায় বিমুগ্ধ হইয়া অন্যমনস্ক ছিল, সেই সময়ে রাজপুত অতি সাবধানে পাদবিক্ষেপ করিতে করিতে গুহামধ্যে প্রবেশ করিলেন । দলপতি গুহাদ্বারের দিকে পশ্চাৎ ফিরিয়া বসিয়া ছিল। প্রবেশ করিয়া রাজপুত বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী - দৃঢ়মুষ্টিস্কৃত তরবারি দলপতির মস্তকে আঘাত করিলেন। তাহার হস্তে এত বল যে, এক আঘাতেই মস্তক দ্বিখণ্ড হইয়। ভূতলে পড়িয়া গেল । সেই মুহূর্তেই দ্বিতীয় এক জন দস্থ্য, যে দলপতির কাছে বসিয়া ছিল, তাহার দিকে ফিরিয়া রাজপুত তাহার মস্তকে এরূপ কঠিন পদাঘাত করিলেন যে, সে মুচ্ছিত হইয়া ভূতলে পড়িল। রাজপুত অন্ত দুই জনের উপর দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন যে, এক জন গুহাপ্রাস্তে থাকিয়া তাহাকে প্রহার করিবার জন্য এক খণ্ড বৃহৎ প্রস্তর তুলিতেছে। রাজপুত তাহাকে লক্ষ্য করিয়া পিস্তল উঠাইলেন ; সে আহত হইয়া ভূতলে পড়িয়া তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ করিল। অবশিষ্ট মাণিকলাল, বেগতিক দেখিয়া গুহাদ্বার-পথে বেগে নিষ্ক্রান্ত হইয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল । রাজপুতও বেগে তাহার পশ্চাৎ ধাবিত হইয়া গুহা হইতে নিষ্ক্রাস্ত হইলেন । এই সময়ে রাজপুত ষে বর্শা বনমধ্যে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন, তাহ মাণিকগালের পায়ে ঠেকিল। মাণিকলাল তৎক্ষণাৎ তাহা তুলিয়া লইয়া দক্ষিণ হস্তে ধারণ করিয়া রাজপুতের দিকে ফিরিয়া দাড়াইল । তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “মহারাজ, আমি আপনাকে চিনি, ক্ষান্ত হউন, নহিলে এই বর্শায় বিদ্ধ করিব।” রাজপুত হাসিয়া বলিলেন, “তুমি যদি আমাকে বর্শা মারিতে পারিতে, তাহা হইলে আমি উহা বাম হস্তে ধরিতাম। কিন্তু তুমি উহা মারিতে পারিবে নাএই দেখ ”—এই কথা বলিতে না বলিতে রাজপুত র্তাহার হাতের খালি পিস্তল দম্যর দক্ষিণ হস্তের মুষ্টি লক্ষ্য করিয়া ছুড়িয়া মারিলেন। দারুণ প্রহারে তাহার হাতের বর্শা খসিয়া পড়িল। রাজপুত তাহ তুলিয়া লইয়া মাণিকলালের চুল ধরিলেন, এবং অসি উত্তোলন করিয়! তাহার মস্তকচ্ছেদনে উষ্ঠত হইলেন । . মাণিকলাল তখন কাতরস্বরে বলিল, “মহারাজাধিরাজ ! আমার জীবনদান করুন—রক্ষা করুন— আমি শরণাগত ” রাজপুত তাহার কেশ ত্যাগ করিলেন, তরবারি নামাইলেন। বলিলেন, “তুই মরিতে এত ভীত কেন ?” মাণিকলাল বলিল, “আমি মরিতে ভীত নহি । কিন্তু আমার একটি সাত বৎসরের কন্যা আছে ; সে মাতৃহীন, তাহার আর কেহ নাই—কেবল আমি । আমি প্রাতে তাহাকে আহার করাইয়া বাহির হইয়াছি, আবার সন্ধ্যাকালে গিয়া আহার দিব, তবে সে খাইবে ; আমি তাহাকে রাখিয়া মরিতে