পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৩৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ S.> বীরের ধৰ্ম্ম । সমগ্র ক্ষত্ৰকুলের সহিত যুদ্ধ করিয়া পাণ্ডব দ্রৌপদী লাভ করিয়াছিলেন । কাশীরাজ্যে সমবেত রাজমণ্ডলী-সমক্ষে আপন বীৰ্য্য প্রকাশ করিয়া ভীষ্মদেব রাজকন্যাগণকে লইয়া আসিয়াছিলেন । হে রাজন্‌ ! রুক্মিণীর বিবাহ মনে পড়ে না ? আপনি এই পৃথিবীতে আজিও অদ্বিতীয় বীর—আপনি কি বীরধৰ্ম্মে পরায়ুখ হইবেন ? “তবে আমি যে আপনার মহিষী হুইবার কামনা করি, ইহা দুরাকাজক্ষ বটে। যদি আমি আপনার গ্রহণযোগ্য ন হই, তাহা হইলে আপনার সঙ্গে অন্তবিধ সম্বন্ধ স্থাপন করিবারও কি ভরসা করিতে পারি না ? অন্ততঃ ঘাহাতে সেরূপ অনুগ্রহও আমার অপ্রাপ্য না হয়, এই অভিপ্রায় করিয়া গুরুদেবহস্তে রাখির বন্ধন পাঠাইলাম । তিনি রাখি বাধিয়া দিবেন।--তার পর আপনার রাজধৰ্ম্ম আপনার হাতে । আমার প্রাণ অামার হাতে । যদি দিল্লী যাইতে হয়, দিল্লীর পথে বিষভোজন করিব ।” পত্র পাঠ করিয়া রাজসিংহ কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হইলেন। পরে মাথা তুলিয়া মাণিকলালকে বলিলেন, “মাণিকলাল, এ পদের কথা তুমি ছাড়া আর কে জানে ?” মাণিকলাল । যাহারা জানি ভ, মহারাজ গুহামধ্যে তাহাদিগকে বধ করিয়া আসিয়াছেন । রাজা । উত্তম। তুমি গৃহে যাও। উদয়পুরে আসিয়া আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিও। এ পত্রের কথা কাহারও সাক্ষাতে প্রকাশ করিও না । এই বলিয় রাজসিংহ, নিকটে যে কয়টি স্বর্ণমুদ্রা ছিল, তাহ মাণিকলালকে দিলেন । মাণিকলাল প্রণাম করিয়৷ বিদায় হইল । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ মাতাজীকি জয় রাণা অনন্ত মিশ্রকে তাহার প্রতীক্ষা করিতে বলিয়া গিয়াছিলেন, অনন্ত মিশ্রও র্তাহার অপেক্ষা করিতেছিলেন–কিন্তু তাহার চিত্ত স্থির ছিল না । অশ্বারোহীর ষোদ্ধবেশ এবং তীব্রভৃষ্টিতে তিনি কিছু কাতর হইয়াছিলেন। একবার ঘোরতর বিপদগ্ৰস্ত হইয়া ভাগ্যক্রমে প্রাণে রক্ষা পাইয়াছেন–কিন্তু আর সব হারাইয়াছেন—চঞ্চলকুমারীর আশা-ভরসা হারাইয়াছেন—আর কি বলিয়া তাহার কাছে মুখ দেখাইবেন ? ব্রাহ্মণ এইরূপ ভাবিতেছিলেন, এমন সময়ে দেখিলেন, পৰ্ব্বতের উপর দুই তিন জন লোক দাড়াইয়৷ কি পরামর্শ করিতেছে। ব্রাহ্মণ ভীত হইলেন ; মনে করিলেন, আবার নূতন দস্থ্যসম্প্রদায় আসিয়া উপস্থিত হইল না কি ? সেবার-নিকটে যাহা হয় কিছু ছিল, তাহ পাইয়া দস্থ্যর তাহার প্রাণবধে বিরত হইয়াছিল—এবার যদি ইহারা তাহাকে ধরে, . তবে কি দিয়া প্রাণ রাখিবেন ? এইরূপ ভাবিতেছিলেন, এমন সময়ে দেখিলেন যে, পৰ্ব্বতারূঢ় ব্যক্তিরা হস্ত প্রসারণ করিয়া তাহাকে দেখাইতেছে এবং পরম্পর কি বলিতেছে । ইহা দেখিবামাত্র বাহ্মণের যে কিছু সাহস ছিল, তাহ গেল । ব্রাহ্মণ পলায়নের উদ্যোগে উঠিয়া দাড়াইলেন । সেই সময়ে পৰ্ব্বতবিহারীদিগের মধ্যে এক জন পৰ্ব্বত অবতরণ করিতে আরম্ভ করিল – দেখিয়া ব্রাহ্মণ উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল। তখন “ধর ধর” করিয়া তিন চারি জন তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল-ব্রাহ্মণও ছুটিল-অজ্ঞান, মুক্তকচ্ছ, তথাপি “নারায়ণ নারায়ণ’ স্মরণ করিতে করিতে ব্রাহ্মণ তীরবত বেগে পলাইল । যাহারা র্তাহার পশ্চাদ্ধাবিত হইয়াছিল, তাহীরা তাহাকে শেষ আর না দেখিতে পাইয়া প্রতিনিবৃত্ত হইল । তাহারা অপর কেহই নহে—মহারাণার ভৃত্যুবৰ্গ । মহারাণার সহিত এ স্থলে কি প্রকারে আমাদিগের সাক্ষাৎ হইল, তাহা এক্ষণে বুঝাইতে হইতেছে। রাজপুতগণের শিকারে বড় আনন্দ । অদ্য মহারাণী শত অশ্বারোহী এবং ভূত্যগণসমভিব্যাহারে মৃগয়ায় বাহির হইয়াছিলেন । এক্ষণে র্তাহার শিকারে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া উদয়পুরাভিমুখে যাইতেছিলেন। রাজসিংহ সৰ্ব্বদা প্রহরগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হইয়া, রাজী হইয়া থাকিতে ভালবাসিতেন না । কখন কখন অনুচরগণকে দূরে রাখিয়া একাকী অশ্বারোহণ করিয়৷ ছদ্মবেশে - প্রজাদিগের অবস্থা দেখিয়া শুনিয়া বেড়াইতেন । সেই জন্য র্তাহার রাজ্যে প্রজা অত্যন্ত মুখী হইয়া উঠিয়াছিল ; স্বচক্ষে সকল দেখিতেন, স্বহস্তে সকল দুঃখ নিবারণ করিতেন । অদ্য মৃগয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে তিনি অনুচরবর্গকে পশ্চাতে আসিতে বলিয়া দিয়া, বিজয়নামা দ্রুতগামী অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া একাকী অগ্রসর হইয়াছিলেন । এই অবস্থায় অনন্ত মিশ্রের সহিত সাক্ষাৎ হইলে যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা কথিত হইয়াছে, রাজা দক্ষ্যকৃত অত্যাচার শুনিয়া স্বহস্তে ব্রহ্মস্ব উদ্ধারের জন্য ছুটিয়াছিলেন । ষাহা দুঃসাধ্য এবং বিপৎপুর্ণ, তাহাতেই তাহার আমোদ ছিল।