পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৪১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


లి{ বলিয়া স্বয়ং সেইখানে বসিলেন। রাজা তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এখানে কেন আসিয়াছ ?” মাণিকলাল বলিল, “প্ৰভু যেখানে, ভৃত্য সেইখানে যাইবে । বিশেষ যখন আপনি এরূপ বিপজ্জনক কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হুইয়াছেন, তখন যদি ভূত্য কোনও কার্য্যে লাগে, এই ভরসায় আসিয়াছে। মোগলের দুই সহস্ৰ—মহারাজের সঙ্গে একশত। আমি কি প্রকারে নিশ্চিন্তু থাকিব ? আপনি আমাকে জীবন দান করিয়াছেন—এক দিনেই কি তাহা ভুলিব ?” রাণা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমি যে এখানে আসিয়াছি, তুমি কি প্রকারে জানিলে ?” মাণিকলাল তখন আদ্যোপাস্ত সকল বলিল । শুনিয়া রাণা সন্তুষ্ট হইলেন । বলিলেন, “আসিয়াছ, ভালই করিয়াছ—আমি তোমার মত সুচতুর লোক এক জন খুজিতেছিলাম। আমি যাহা বলি– পারিবে ? ' 鹉 মাণিকলাল বলিল, “মনুষ্যের যাহা সাধা, তাহ। করিব।” । রাণী বলিলেন, “আমরা একশত যোদ্ধা মাত্র ; মোগলের সঙ্গে দুই হাজার—আমরা রণ করিয়া প্রাণত্যাগ করিতে পারি, কিন্তু জয়ী হইতে পারিব না । যুদ্ধ করিয়া রাজকন্যার উদ্ধার করিতে পারিব না। রাজকন্যাকে আগে বঁাচাইয়। পরে যুদ্ধ করিতে হইবে । রাজকন্যা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকিলে তিনি আহত হইতে পারেন, র্তাহার রক্ষা প্রথমে চাই ।” মাণিকলাল বলিল, “আমি ক্ষুদ্র জীব, আমি সে সকল কি প্রকারে বুঝিব, আমাকে কি করিতে হইবে, তাহাই আজ্ঞা করুন ।” রাণা বলিলেন, “তোমাকে মোগল অশ্বারোহীর বেশ ধরিয়া কল্য মোগলসেনার সঙ্গে আসিতে হইবে। রাজকুমারীর শিবিকার সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে থাকিতে হইবে এবং যাহা যাহা বলিতেছি, তাহা করিতে"হইবে।” রাণা তাহাকে সবিস্তার উপদেশ দিলেন । মাণিকলাল শুনিয়া বলিল, “মহারাজের জয় হউক! আমি কাৰ্য্য সিদ্ধ করিব, আমাকে অনুগ্রহ করিয়া একটি ঘোড়া বখশিস করুন।” রাণা । আমরা একশত যোদ্ধা, একশত ঘোড়া, আর ঘোড়া নাই যে, তোমায় দিই। অন্ত কাহারও ঘোড়া দিতে পারিব না। আমার ঘোড়া লইতে পায় । মাণিক। তাহা প্রাণ থাকিতে লইব না, আমাকে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার দিন । বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী রাণী । কোথায় পাইব ? যাহা আছে, তাঁহাতে আমাদের কুলায় না। কাহাকে নিরস্ত্র করিয়া তোমাকে হাতিয়ার দিব ? অামার হাতিয়ার লইতে পার । মাণিক । তাহা হইতে পারে না, আমাকে পোষাক দিতে আজ্ঞা হউক । রাণা। এখানে ষাহা পরিয়া আসিয়াছি, তাহী ভিন্ন আর পোষাক মাই। আমি কিছুই দিব না । মাণিক। মহারাজ ! তবে অনুমতি দিউন, আমি যে প্রকারে হউক, এ সকল সংগ্ৰহ করিয়া লই । রাণ হাসিলেন । বলিলেন, "চুরি করিবে ?” মাণিকলাল জিহব| কাটিল । বলিল, “আমি শপথ করিয়াছি ষে, আর সে কার্য্য করিব না ।” রাণী । তবে কি করিবে ? মাণিক । ঠকাইয়া লইব । রাণ হাসিলেন । বলিলেন, “যুদ্ধকালে সকলেই চোর—সকলেই বঞ্চক। আমিও বাদশাহের বেগম চুরি করিতে আসিয়াছি—চোরের মত লুকাইয়া আছি। তুমি যে প্রকারে পার, এ সকল সংগ্ৰহ করিও ” মাণিকলাল প্রফুল্লচিত্তে প্রণাম করিয়া বিদায় झुझेश । দশম পরিচ্ছেদ রসিক পানওয়ালী মাণিকলাল তখনই রূপনগরে ফিরিয়া আসিল । তখন সন্ধ্য উত্তীর্ণ হইয়াছে ৷ রূপনগরের বাজারে গিয়া মাণিকলাল দেখিল যে, বাজার অত্যন্ত শোভাময় । দোকানের শত শত প্রদীপের শোভায় বাজার আলোকময় হইয়াছে—নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য উজ্জলবর্ণে রসন আকুল করিতেছে ; পুষ্প, পুষ্পমালা থরে থরে নয়ন রঞ্জিত এবং ঘ্ৰাণে মন মুগ্ধ করিতেছে । মাণিকের উদ্দেশু অশ্ব ও অস্ত্র সংগ্রহ করা, কিন্তু তাই বলিয়া আপন উদরকে বঞ্চনা করা মাণিকলালের অভিপ্রায় ছিল না। মাণিক গিয়া কিছু মিঠাই কিনিয়া খাইতে আরম্ভ করিল । সের পাচ ছয় ভোজন করিয়া মাণিক দেড় সের জল খাইল এবং দোকানদারকে উচিত মূল্য দান করিয়া তামূলান্বেষণে গেল । দেখিল, একটা পানের দোকানে বড় জাক । দেখিল, দোকানে বহুসংখ্যক দীপ বিচিত্র ফানুষমধ্য হইতে স্নিগ্ধ জ্যোতিঃ বিকীর্ণ করিতেছে। দেওয়ালে নানাবর্ণের কাগজ মোড়া-নানাপ্রকার বাহারের