পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৪৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ উপর আরোহী চাপিয়া পড়িতে লাগিল—সৈনিকেরা পরম্পর অস্ত্রাঘাত করিয়া পথ করিতে লাগিল— শৃঙ্খলা একেবারে ভগ্ন হইয়া গেল, সৈন্যমধ্যে মহা কোলাহল পড়িয়া গেল । “কাহার লোগ ছ’সিয়ার । বঁ। রাস্ত৷ ” মাণিকলাল হাকিল। যেখানে রাজকুমারী শিবিকায় এবং পশ্চাতে মাণিকলাল, তাহার সম্মুখেই এই গোলযোগ উপস্থিত । বাহকেরা আপনাদের প্রাণ লইয়া ব্যতি ব্যস্ত-অশ্বসকল পাছু হঠিয় তাহাদের উপর চাপিয়া পড়িতেছে । পাঠকের স্মরণ থাকিতে পারে, এই পাৰ্ব্বত্য পথের বামদিক দিয়া একটি অতি সঙ্কীর্ণ রন্ধ্রপথ বাহির হইয়া গিয়াছে, তাহাতে একেবারে একটিমাত্র অশ্বারোহী প্রবেশ করিতে পারে। তাহারই কাছে যখন সেনামধ্যস্থিত শিবিকা পৌঁছিয়াছিল, তখনই এই হুলস্থূল উপস্থিত হইরাছিল । ইহাই রাজসিংহের বন্দোবস্ত । সুশিক্ষিত মাণিকলাল প্রাণভয়ে ভীত বাহকদিগকে ঐ পথ দেখাইয়। দিল । মাণিকলালের কথা শুনিবামাত্র বাহকের আপনাদিগের ও রাজকুমারীর প্রাণরক্ষার্থ ঝটিতি শিবিকা লইয়া সেই পথে প্রবেশ করিল। সঙ্গে সঙ্গে অশ্ব লষ্টয়া মাণিকলালও তন্মধ্যে প্রবেশ করিল। নিকটস্থ সৈনিকের। দেখিল যে, প্রাণ বাচাইবার এই এক পথ ; তখন আর এক জন অশ্বারোহী মাণিকলালের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই পথে প্রবেশ করিতে গেল । সেই সময়ে উপর হইতে একটা অতি বৃহৎ শিলাখণ্ড গড়াইতে গড়াইতে, শব্দে পাৰ্ব্বত্য প্রদেশ কঁপাইতে র্কাপাইতে আসিয়া সেই রন্ধমুখে পড়িয়া স্থিতিলাভ করিল। তাহার চাপে দ্বিতীয় অশ্বারোগী অশ্বসমেত চূর্ণ হইয় গেল । রন্ধমুখ একেবারে বন্ধ হইয়া গেল। আর কেহ সেই পথে প্রবেশ করিতে পারিল না। একা মাণিকলাল শিবিকাসঙ্গে যথেসিত পথে চলিল । সেনাপতি হাসান আলি খাঁ মনৃসবদার তখন সৈন্তের সর্বপশ্চাতে ছিলেন। প্রবেশপথ-মুখে স্বয়ং দাড়াইয়া সঙ্কীর্ণ দ্বারে সেনার প্রবেশের তত্ত্বাবধান করিতেছিলেন। পরে সমুদয় সেনা প্রবিষ্ট হইলে স্বয়ং ধীরে ধীরে সর্বপশ্চাতে আসিতেছিলেন । দেখিলেন, সহসা সৈনিকশ্রেণী মহাগোলযোগ করিয়া পিছু হঠিতেছে। কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, কেহ কিছু ভাল বুঝাইয়া বলিতে পারে না । তখন সৈনিকগণকে ভৎসনা করিয়া ফিরাইতে লাগিলেন – এবং স্বয়ং সৰ্ব্বাঞ্জগামী হুইয়া ব্যাপার কি দেখিতে চলিলেন । 8X কিন্তু ততক্ষণ সেনা থাকে না। পূৰ্ব্বেই কথিত হইয়াছে যে, এই পৰ্ব্বতের দক্ষিণপাশ্বস্থ পৰ্ব্বত অতি উচ্চ এবং দুরারোহণীয়—তাহার শিখরদেশ প্রায় পথের উপর ঝুলিয়া পড়িয়া পথ অন্ধকার করিয়াছে। রাজপুতেরা তাহার প্রদেশাস্তরে অনুসন্ধান করিয়া পথ বাহির করিয়া পঞ্চাশ জন তাহার উপর উঠিয়া অদৃষ্ঠভাবে অবস্থান করিতেছিল । এক এক জন অপরের চল্লিশ পঞ্চাশ হাত দূরে স্থান গ্রহণ করিয়া সমস্ত রাত্রি ধরিয়৷ শিলাখণ্ড সংগ্ৰহ করিয়া আপন আপন সম্মুখে একটি একটি ঢিপি সাজাইয়া রাখিয়াছিল । এক্ষণে পলকে পলকে পঞ্চাশ জন পঞ্চাশ খণ্ড শিলা নিম্নস্থ আরোহীদিগের উপর বৃষ্টি করিতেছিল । এক একবারে পঞ্চাশটি আশ্ব বা আরোহী আহত বা নিহত হইতেছিল । কে মারিতেছিল, তাহা তাহারা দেখিতে পায় না । দেখিতে পাইলেও দুরারোহণীর পৰ্ব্বতশিখরস্থ শত্ৰগণের প্রতি কোনরূপেই আঘাত সম্ভব নহে—অতএব মোগলের পলায়ন ভিন্ন অন্ত কোন চেষ্টাই করিতেছিল না । যে সহস্ৰসংখ্যক অশ্বারোহী শিবিকার অগ্রভাগে ছিল, তাহার মধ্যে হত ও আহতের অবশিষ্ট পলায়ন পূর্বক রন্ধমুখে নির্গত হইয় প্রাণরক্ষা করিল। পঞ্চাশ জন রাজপুত দক্ষিণপাশ্বের উচ্চ পৰ্ব্বত হইতে শিলাবৃষ্টি করিতেছিল—আর পঞ্চাশ জন স্বয়ং রাজসিংহের সহিত বামদিকের অনুচ্চ পৰ্ব্বত-শিখরে লুক্কায়িত ছিল, তাহার এতক্ষণ কিছুই করিতেছিল না । কিন্তু এক্ষণে তাহদের কার্য্য করিবার সময় উপস্থিত হইল। ষেখানে শিলাবৃষ্টি নিবন্ধন ঘোরতর বিপত্তি, সেখানে মবারক অবস্থিতি করিতেছিলেন । তিনি প্রথমে সৈন্তগণকে সুশৃঙ্খলের সহিত পাৰ্ব্বত্যপথ হইতে বহিষ্কৃত করিবার যত্ন করিয়াছিলেন, কিন্তু যখন দেখিলেন, ক্ষুদ্রতর রন্ধ্রপথে রাজকুমারীর শিবিকা চলিয়া গেল, এক জনমাত্র অশ্বারোহী তাহার সঙ্গে গেল, অমনি অর্গলের ন্যায় বৃহৎ শিলাখণ্ড সে পথ বন্ধ করিল—তখন র্তাহার মনে সন্দেহ উপস্থিত হইল যে, এ ব্যাপার আর কিছুই নহে—কোন দুরাত্মা রাজকুমারীকে অপহরণ করিবার মানসে এই উদ্যম করিয়াছে । তখন তিনি ডাকিয়া নিকটস্থ সৈনিকগণকে বলিলেন—“প্রাণ যায়, সেও স্বীকার, শত সওয়ার দোলার পিছু পিছু যাও । ঘোড়া ছাড়িয়া পাওদলে এই পাথর টপকাইয়া যাও—চল, আমি যাইতেছি।” মবারক অগ্রে ঘোড়া হইতে লাফাইয়া পড়িয়া পথরোধক শিলাখণ্ডের উপর উঠিলেন এবং তাহার উপর হইতে লাফাইয়া নীচে পড়িলেন ।