পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৪৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88 রাজসিংহ তখন হাসিলেন--বলিলেন, “অনেকক্ষণ বুঝিয়াছি রাজকুমারী- রমণীকুলে তুমি ধন্য। কিন্তু তুমি যাহা ভাবিতেছ, তাহা হইবে না। আজ রাজপুতের বাচা হইবে না, আজ রাজপুতকে মরিতেই হইবে—নহিলে রাজপুতনামে বড় কলঙ্ক হইবে । আমরা যতক্ষণ না মরি—ততক্ষণ তুমি বন্দী ৷ আমরা মরিলে তুমি যেখানে ইচ্ছা, সেইখানে যাইও ।” চঞ্চলকুমারী হাসিল—অতিশয় প্রণয়প্রফুল্ল, ভক্তিপ্রণোদিত, সাক্ষাৎ মহাদেবের অনিবাৰ্য্য এক কটাক্ষবাণ রাজসিংহের উপর ত্যাগ করিল। মনে মনে বলিতে লাগিল, “বীরচুড়ামণি ! আজি হইতে তোমার দাসী হইলাম। যদি তোমার দাসী না হই, তবে চঞ্চল কখনই প্রাণ রাখিবে না " প্রকাশুে বলিল, “মহারাজ ! দিল্লীশ্বর ষাহাকে মহিষী করিতে অভিলাষ করিয়াছেন, সে কাহারও বন্দী নহে। এই আমি মোগল সৈন্তসম্মুখে চলিলাম—কাহার সাধ্য রাখে দেখি ?” এই বলিয়া চঞ্চলকুমারী—জীবন্ত দেবীমূৰ্ত্তি, রাজসিংহকে পাশ করিয়া রন্ধ্ৰমুখে চলিল। তাহাকে স্পর্শ করে, কাহার সাধ্য ? এ জন্য কেহ তাহার গতিরোধ করিতে পারিল না। হাসিতে হাসিতে, হেলিতে ছুলিতে সেই স্বর্ণমুক্তাময়ী প্রতিম রন্ধমুখে চলিয়া গেল । একাকিনী চঞ্চলকুমারী সেই প্রজলিত বহ্নিতুল্য রুষ্ট, সশস্ত্র পঞ্চশত মোগল অশ্বারোহীর সম্মুখে গিয়৷ দাড়াইলেন । যেখানে সেই পথরোধকারী কামান— মনুষ্য-নিৰ্ম্মিত বজ্র, অগ্নি উদগীর্ণ করিবার জন্য ই৷ করিয়া আছে—তাহার সম্মুখে, রত্নমণ্ডিত লোকাতীত সুন্দরী দাড়াইল । দেখিয়া বিস্মিত মোগলসেনা মনে করিল-পৰ্ব্বতনিবাসিনী পরী আসিয়াছে । মনুষ্যভাষায় কথা কহিয়া চঞ্চলকুমারী সে ভ্রম ভাঙ্গিল ।—বলিল, “এ সেনার সেনাপতি কে ?” মবারক স্বয়ং রন্ধমুখে রাজপুতগণের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন—তিনি বলিলেন, “ইহারা এখন অধমের অধীন । আপনি কে ?” চঞ্চলকুমারী বলিলেন, “আমি সামান্য স্ত্রী। আপনার কাছে কিছু ভিক্ষা আছে—যদি অন্তরালে শুনেন, ভবেই ৰলিতে পারি।” মবারক বলিলেন, “তবে রক্রমধ্যে আগু হউন ৷” চঞ্চলকুমারী রন্ধমধ্যে অগ্রসর হইলেন—মবারক পশ্চাৎ গশচাৎ গেলেন । বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী যেখানে কথা অন্তে শুনিতে পায় না, এমন স্থানে আসিয়া, চঞ্চলকুমারী বলিতে লাগিলেন, “আমি রূপনগরের রাজকন্য) । বাদশাহ আমাকে বিবাহ করিবার অভিলাষে আমাকে লইতে এই সেন পাঠাইয়াছেন— এই কথা বিশ্বাস করেন কি ?” , মবারক । আপনাকে দেখিয়াই সে বিশ্বাস হয় । চঞ্চল । আমি. মোগলকে বিবাহ করিতে অনি ছুক—ধৰ্ম্মে পতিত হইব মনে করি । কিন্তু পিতা ক্ষীণবল—তিনি আমাকে আপনাদিগের 驚 য়াছেন। তাহা হইতে কোন ভরসা নাই বলিয়। আমি রাজহিংহের কাছে দূত প্রেরণ করিয়াছিলামতামার কপালক্রমে তিনি পঞ্চাশজন মাত্র সিপাহী লইয়া আসিয়াছেন । তাহাদের বলবীৰ্য্য ত দেখিলেন ? or মবারক চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, “সে কি— পঞ্চাশ জন সিপাহী এত মোগল মারিল ?” চঞ্চল। বিচিত্র নহে-হলুদীঘাটে ঐ রকম কি একটা হইয়াছিল শুনিয়াছি । কিন্তু সে যাহাই হউক,—রাজসিংহ এক্ষণে আপনার নিকট পরাস্ত । র্তাহাকে পরাস্ত দেখিয়াই আমি আসিয়া ধর দিতেছি। আমাকে দিল্লী লইয়া চলুন—যুদ্ধে আর প্রয়োজন নাই । - মবারক বলিল, “বুঝিয়াছি, নিজের স্থখ ত্যাগ করিয়া আপনি রাজপুতের প্রাণরক্ষা করিতে চাহেন। তাহাদেরও কি সেই ইচ্ছা ?” চ । সেও কি সস্তবে ? আমাকে আপনার লইয়া চলিলেও তাহার যুদ্ধ ছাড়িবে না । আমার অনুরোধ, আমার সঙ্গে একমত হইয়া আপনি তাহাদের প্রাণরক্ষা করুন । ম। তাহ পারি, কিন্তু দস্থ্যর দণ্ড অবশু দিতে হইবে । আমি তাহাদের বন্দী করিব । চ। সব পারিবেন—সেইটি পরিবেন না । তাহাদিগকে প্রাণে মারিতে পারিবেন, কিন্তু বাধিতে পারিবেন না। তাহারা সকলেই মরিতে স্থির-প্রতিজ্ঞ হইয়াছেন—মরিবেন । ম। তাহা বিশ্বাস করি । কিন্তু আপনি দিল্লী যাইবেন, ইহা স্থির ? চ। আপনাদিগের সঙ্গে আপাততঃ যাওয়াই স্থির। দিল্লী পৰ্য্যস্ত পৌছিব কি ন সন্দেহ । ম। সে কি ? চ। আপনার যুদ্ধ করিয়া মরিতে জানেন, আমরা স্ত্রীলোক, আমরা কি শুধু শুধু মরিতে ' “ জানি না ? -