পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৫৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ তখন মবারককে লইয়া দরিয়া দিল্লীর পথে চলিল। দোলায় উঠিবার সময় মবারক দরিয়ার মুখচুম্বন করিয়া বলিল, “আর কখনও তোমায় ত্যাগ করিব না ।" উপযুক্ত স্থানে উপস্থিত হইয়া, দরিয়া মবারকের শুশ্রুষা করিল । দরিয়ার চিকিৎসাতেই মবারক আরোগ্য লাভ করিল। দিল্লীতে পৌঁছিলে, মবারক দরিয়ার হাত ধরিয়া আপন গৃহে লইয়া গেল। দিন কতক ইহাতে উভয়ে বড় সুখী হইল । তার পর ইহার যে ফল উপস্থিত হইল, তাহা ভয়ানক। দরিয়ার পক্ষে ভয়ানক, মবারকের পক্ষে ভয়ানক, জেব-উন্নিসার পক্ষে ভয়ানক, ঔরঙ্গজেবের পক্ষে ভয়ানক । সে অপূৰ্ব্ব রহস্য আমি পশ্চাৎ বলিব । এক্ষণে চঞ্চলকুমারীর কথা কিছু বলা আবশুক । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ রাজসিংহের পরাভব রাজসিংহ উদয়পুরে আসিলেন বলিয়াছি। চঞ্চলকুমারীর উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ, এ জন্য চঞ্চলকুমারীকেও উদয়পুরে লইয়া আসিয়া রাজাবরোধে সংস্থাপিত করিলেন । কিন্তু তাহাকে উদয়পুরে রাখিবেন, কি রূপনগরে তাহার পিতার নিকট পাঠাইয়া দিবেন, ইহার মীমাংসা তাঙ্গর পক্ষে কঠিন হইল। তিনি যত দিন ইহার সুমীমাংসা করিতে ন পারিলেন, তত দিন চঞ্চলকুমারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন না। এ দিকে চঞ্চলকুমারী রাজার ভাবগতিক দেখিয়া অতিশয় বিস্মিত হইলেন । ভাবিলেন, “রাজা যে আমাকে বিবাহ করিয়া গ্ৰহণ করিবেন, এমন ত ভাবগতিক কিছুই দেখিতেছি না। যদি না করেন, তবে কেন অামি উহার অন্তঃপুরে বাস করিব ? যাবই বা কোথায় ?” রাজসিংহ কিছু মীমাংসা করিতে না পারিয়া কতিপয় দিন পরে, চঞ্চলকুমারীর মনের ভাব জানিবার জন্য র্তাহার কাছে গিয়া উপস্থিত হইলেন । যাইবার সময়ে যে পত্ৰখানি চঞ্চলকুমারী অনস্ত মিশ্রের হাতে পাঠাইয়াছিলেন, যাহা রাজসিংহ মাণিকলালের নিকট পাইয়াছিলেন, তাহা লইয়া গেলেন । রাণা আসন গ্রহণ করিলে, চঞ্চলকুমারী তাহাকে প্রণাম করিয়া, সলজ্জ এবং বিনীতভাবে একপাশ্বে ধা ডাইয়া রহিলেন । লোকমনোমোহিনী মূৰ্ত্তি দেখিয়া 6:S রাজা একটু মুগ্ধ হইলেন । কিন্তু তখনই মোহ পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন, “রাজকুমারী ! এক্ষণে তোমার কি অভিপ্রায়, তাহ জানিবার জন্য আমি আসিয়াছি। তোমার পিত্রালয়ে যাইবার অভিলাষ, না এইখানে থাকিতেই প্রবৃত্তি ?” শুনিয়া চঞ্চলকুমারীর হৃদয় যেন ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি কথা কহিতে পারিলেন না—নীরবে রহিলেন । তখন রাণা চঞ্চলকুমারীর পত্ৰখানি বাহির করিয়া চঞ্চলকুমারীকে দেখাইলেন । জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ তোমার পত্র বটে ?” চঞ্চল বলিল, “আজ্ঞা হুঁ৷ ” রাণী । কিন্তু সবটুকু এক হাতের লেখা নহে । দুই হাতের লেখা দেখিতেছি । তোমার নিজের হাতের কোন অংশ আছে কি ? চঞ্চল । প্রথম ভাগটা আমার হাতের লেখা ৷ রাণা। তবে শেষভাগটা অন্যের লেখা ? পাঠকের স্মরণ থাকিবে যে, এই শেষ অংশেই বিবাহের প্রস্তাবটা ছিল। চঞ্চলকুমারী উত্তর করিলেন, “আমার হাতের নহে ।” রাজসিংহ জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিন্তু তোমার সম্মতিক্রমেই ইহা লিখিত হইয়াছিল ?” প্রশ্নটা অতি নিৰ্দ্দয়। কিন্তু চঞ্চলকুমারী আপনার উন্নত স্বভাবের উপযুক্ত উত্তর করিলেন । বলিলেন, “মহারাজ ! ক্ষত্রিয় রাজগণ বিবাহাৰ্থই কন্যাহরণ করিতে পারেন। অন্য কোন কারণে কন্যাহরণ মহাপাপ । মহাপাপ করিতে আপনাকে অনুরোধ করিব কি প্রকারে ?” রাণী । আমি তোমাকে হরণ করি নাই, তোমার জাতিকুল রক্ষার্থ তোমাকে মুসলমানের হাত হষ্টতে উদ্ধার করিয়াছি। এক্ষণে তোমাকে তোমার পিতার নিকট প্রতিপ্রেরণ করাই রাজধৰ্ম্ম । চঞ্চলকুমারী কয়টা কথা কহিয়৷ যুৱতী-সুলভ লজ্জাকে বশে আনিয়াছিল। এক্ষণে মুখ তুলিয়া রাজসিংহের প্রতি চাহিয়া বলিল, “মহারাজ ! আপনার রাজধৰ্ম্ম আপনি জানেন । আমার ধৰ্ম্মও আমি জানি । আমি জানি যে, যখন আমি আপনার চরণে আত্মসমর্পণ করিয়াছি, তখন আমি ধৰ্ম্মতঃ আপনার মহিষী । আপনি গ্রহণ করুন বা না করুন, ধৰ্ম্মতঃ আমি আর কাহাকেও বরণ করিতে পারিব না । যখন ধৰ্ম্মতঃ আপনি আমার স্বামী, তখন আপনার আজ্ঞা মাত্র শিরোধাৰ্য্য । আপনি যদি আমাকে রূপনগরে ফিরিয়া যাইতে বলেন, তবে অবশু আমি যাইব । সেখানে গেলে পিতা আমাকে