পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৫৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৫২ পুনৰ্ব্বার বাদশাহের নিকট পাঠাইতে বাধ্য হইবেন । কেন না, আমাকে রক্ষা করিবার তাহার সাধ্য নাই । —ষদি তাঁহাই অভিপ্রেত, তাহা হইলে রণক্ষেত্রে যখন আমি বলিয়াছিলাম যে, “মহারাজ ! আমি দিল্লী যাইব',—তখন কেন ষাইতে দিলেন না ?” রাজসিংহ । সে আমার আপনার মানরক্ষার্থ। চঞ্চল। তার পর এখন, যে আপনার শরণ লইয়াছে, তাহাকে আবার দিল্লী যাইতে দিবেন কি ? রাজ। তাও হইতে পারে না। তবে তুমি এইখানেই থাক । চঞ্চল। অতিথিস্বরূপ থাকিব ? না দাসী হইয়া ? রূপনগরের রাজকন্যা এখানে মহিষী ভিন্ন আর কিছু হইতে পারে না । রাজ । তোমার মত লোকমনোমোহিনী স্থনদরী যে রাজার মহিষী, সকলেই তাহাকে ভাগ্যবান বলিবে । তুমি এমন অদ্বিতীয় রূপবতী বলিয়াই তোমাকে মহিষী করিতে আমি সন্ধু চত হইতেছি। শুনিয়াছি যে শাস্ত্রে আছে, রূপবতী ভাৰ্য্যা শত্ৰু স্বরূপ— “খুণকারী পিত শক্ৰমাতা চ ব্যভিচারিণী। ভাৰ্য্যা রূপবতী শত্ৰুঃ পুত্ৰঃ শক্ররপণ্ডিতঃ ” চঞ্চলকুমারী একটু হাসিয়া বলিল, “বালিকার বাচালতা মার্জনা করিবেন—উদয়পুরের রাজমহিষীগণ সকলেই কি কুরূপা ?” রাজসিংহ বলিলেন, “তোমার মত কেহই স্বরূপ নহে ।” চঞ্চলকুমারী বলিল, “আমার বিনীত নিবেদন, কথাটা মহিষীদের কাছে বলিবেন না। মহারাণ রাজসিংহেরও ভয়ের স্থান থাকিতে পারে।” রাজসিংহ উচ্চহাস্ত করিলেন । চঞ্চলকুমারী এতক্ষণ দাড়াইয়া ছিল—এখন চাপিয়া বসিল, মনে মনে বলিল, “আর ইনি আমার কাছে মহারাণা নহেন, ইনি এখন আমার বর ” আসনগ্রহণ করিয়া চঞ্চলকুমারী বলিল, “মহারাজ, বিনা আজ্ঞায় আমি ষে মহারাজের সম্মুখে আসনগ্রহণ করিলাম, সে অপরাধ আপনাকে মার্জনা করিতে হইতেছে—কেন না, আমি আপনার নিকট জ্ঞানলাভের আকাজক্ষায় বসিলাম শিষ্যের আসনে অধিকার অাছে। মহারাজ ! রূপবতী ভাৰ্য্যা শত্র কি প্রকারে, তাহা আমি এখনও বুঝিতে পারি নাই। রাজসিংহ । তাহা সহজে বুঝান ষায় । ভাৰ্য্য! রূপবতী হইলে তাছার জন্ত বিবাদ-বিসংবাদ উপস্থিত বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী হয় । এই দেখ, তুমি এখনও আমার ভার্ষ্যা হও নাই, তথাপি তোমার জন্য ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে আমার বিবাদ বাধিয়াছে। আমাদের বংশের মহারাণী পদ্মিনীর কথা শুনিয়াছ ত ? চঞ্চল । ঋষিবাক্যে আমার বড় শ্রদ্ধ হইল না । সুন্দরী মহিষী না থাকিলে রাজারা কি বিবাদ হইতে মুক্তি পান ? অার এ পামরীর জন্য মহারাজ কেন এ কথা তুলেন ? আমি স্বরূপা श्झे, কুরূপ इझे, আমার জন্য যে বিবাদ বাধিবার, তাহা ত বাধিয়াছে। রাজসিংহ । আরও কথা আছে। রূপবতী ভাৰ্য্যাতে পুরুষ অত্যন্ত আসক্ত হয়। ইহা রাজার পক্ষে অত্যন্ত নিন্দনীয়। কেন না, তাহাতে রাজকার্য্যের ব্যাঘাত ঘটে । চঞ্চল। রাজারা বহুশত মহিষী কর্তৃক পরিবৃত থাকিয়াও রাজকাৰ্য্যে অমনোযোগী হয়েন না। আমার দ্যায় বালিকার প্রণয়ে মহারাণ। রাজসিংহের রাজকার্য্যে বিরাগ জন্মিবে, ইহা অতি অশ্রদ্ধার কথা । রাজসিংহ। কথা তত আশ্রদ্ধেয় নহে। শাস্ত্রে বলে, “বৃদ্ধস্ত তরুণী বিষম্‌ ” চঞ্চল । মহারাজ কি বৃদ্ধ ? রাজ ; যুবা নহি । চঞ্চল। যাহার বাহুতে বল আছে, রাজপুতকন্যার কাছে সেই যুৱা । দুৰ্ব্বল যুৰাকে রাজপুত কন্যাগণ বৃদ্ধের মধ্যে গণ্য করেন । রাজ । আমি স্বরূপ নহি । চঞ্চল । কীৰ্ত্তিই রাজাদিগের রূপ । রাজ ৷ রূপবানু, বলবানু, যুবা রাজপুত্রের অভাব নাই । চঞ্চল। আমি আপনাকে আত্মসমর্পণ করিয়াছি। অন্তের পত্নী হইলে দ্বিচারিণী হইব । আমি অত্যন্ত নিল্লজের মত কথা বলিতেছি । কিন্তু মনে করিয়৷ দেখিবেন, দুষ্মন্ত কর্তৃক পরিত্যক্ত হইলে শকুন্তলা লজ্জা ত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । আমারও আজ প্রায় সেই দশা । আপনি আমায় পরিত্যাগ করিলে আমি রাজসমনদরে * ডুবিয়া মরিব । রাজসিংহ বাগযুদ্ধে এইরূপ পরাভব প্রাপ্ত হইয়া বলিলেন, “তুমিই আমার উপযুক্ত মহিষী। তবে তুমি কেবল বিপদে পড়িয়া আমাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছিলে ; এক্ষণে আমার হাত হইতে উদ্ধারের ইচ্ছা রাখ কি না, আমার এই বয়সে তুমি আমাতে

  • রাজসিংহের নিৰ্ম্মিত সরোবর। .