পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৫৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


6:8 চঞ্চলকুমারীর মাতা পত্রের কোন উত্তর দিলেন না। তাহার পিতার পত্র রাজসিংহ চঞ্চলকুমারীকে * পড়িয়া শুনাইলেন । চঞ্চলকুমারী চারিদিক অন্ধকার দেখিল । চঞ্চলকুমারী অনেকক্ষণ নীরব হইয়া থাকিলে তুরাণ র্তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এক্ষণে কি করিব ? পরিণয় বিধেয় কি না ?” চঞ্চলকুমারী-চক্ষের এক বিন্দু, বিন্দুমাত্র, জল মুছিয়া ফেলিয়াবলিলেন, “বাপের এ অভিসম্পাত মাথায় করিয়া কোন কন্যা বিবাহ করিতে সাহস করিবে ?” রাণী । তবে যদি পিতৃগৃহে ফিরিয়া যাইবার অভিপ্রায় কর, তবে পাঠাইতে পারি। চঞ্চল। কাজেই তাই। কিন্তু পিতৃগৃহে যাওয়াও স্বা, দিল্লী যাওয়াও তাই ; তাহার অপেক্ষ বিষপান কিসে মন্দ ? রাণী । আমার এক পরামর্শ শুন । তুমিই অামার যোগ্য মহিষী, আমি সহসা তোমাকে ত্যাগ করিতে পারিতেছি না, কিন্তু তোমার পিতার আশীবৰ্বাদ ব্যতীতও তোমাকে বিবাহ করিব না । সে আশীৰ্ব্বাদের ভরসা আমি একেবারে ত্যাগ করিতেছি না । মোগলের সঙ্গে যুদ্ধ নিশ্চিত । একলিঙ্গ * আমার সহায় । আমি সেই যুদ্ধে হয় মরিব, নয় মোগলকে পরাজিত করিব । চঞ্চল। আমার স্থির বিশ্বাস, মোগল আপনার নিকট পরাজিত হইবে । রাণী । সে অতিশয় দুঃসাধ্য কাজ । যদি সফল হই, তবে নিশ্চিত তোমার পিতার আশীৰ্ব্বাদ পাইব । চঞ্চল। তত দিন ? e রাণা । তত দিন তুমি আমার অন্তঃপুরে থাক । মহিষীদিগের ন্যায় তোমার পৃথক্ রেউল f হইবে। মহিষীদিগের দ্যায় তোমারও দাস-দাসী পরিচর্য্যার ব্যবস্থা করিব । আমি প্রচার করিব যে, অল্পদিনের মধ্যে তুমি আমার মহিষী হইবে এবং সেই বিবেচনায় সকলেই তোমাকে মহিষীদিগের দ্যায় মহারাণী বলিয়া সম্বোধন করিবে । কেবল যত দিন না তোমার সঙ্গে আমার যথাশাস্ত্র বিবাহ হয়, তত দিন আমি তোমার 'সঙ্গে সাক্ষাৎ করিব না । কি বল ? চঞ্চলকুমারী বিবেচনা করিয়া দেখিলেন, “ইহার অপেক্ষ সুব্যবস্থা এক্ষণে আর কিছু হইতে পারে ম৷ ” কাজেই সম্মত হইলেন। রাজসিংহও যেরূপ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, সেইরূপ বন্দোবস্ত করিলেন।

  • রাণাদিগের কুলদেবত—মহাদেব। + অবরোধ ।

বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাৰলী চতুর্থ পরিচ্ছেদ . অগ্নি জালিবার আরও প্রয়োজন মাণিকলালের কাছে নিৰ্ম্মল শুনিল ষে, চঞ্চলকুমারী রাজমহিষী হইলেন। কিন্তু কবে বিবাহ হইল, বিবাহ হইয়াছে কি না, তাহা মাণিকলাল কিছুই বলিতে পারিল না। নিৰ্ম্মল তখন স্বয়ং চঞ্চলকুমারীকে দেখিতে আসিলেন । অনেক দিনের পর নিৰ্ম্মলকে দেখিয়া চঞ্চলকুমারী অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন । সেদিন নিৰ্ম্মলকে যাইতে দিলেন না। রূপনগর পরিত্যাগ করার পর ষাঙ্গা যাহা ঘটিয়াছিল, তাহ পরস্পর পরস্পরের কাছে সবিস্তার বলিলেন । নিৰ্ম্মলের সুখ শুনিয়া চঞ্চলকুমারী আহলাদিত হইলেন । সুখ-কেন না, মাণিকলাল রাণার কাছে অনেক পুরস্কার পাইয়াছিলেন—অনেক টাকা হইয়াছে ; তাহার পর, মাণিকলাল রাণার অনুগ্রহে সৈন্তমধ্যে অতি উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন ; এবং রাজসম্মানে গৌরবান্বিত হইয়াছেন ; নিৰ্ম্মলের উচ্চ অট্টালিকা, ধনদৌলত, দাস-দাসী সব হইয়াছে এবং মাণিকলাল তাহার কেনা গোলাম হইয়াছে। পক্ষাস্তরে, নিৰ্ম্মল চঞ্চলকুমারীর দুঃখ শুনিয়া অতিশয় মৰ্ম্মাহত হইল এবং চঞ্চলকুমারীর পিতামাতা, রাজসিংহ এবং চঞ্চলকুমারীর উপর অতিশয় বিরক্ত হইল। চঞ্চলকুমারীকে সে মহারাণী বলিয়া ডাকিতে অস্বীকৃত হইল এবং মহারাণার সাক্ষাৎ পাইলে তাহাকে দুই কথা শুনাইয়া দিবে, প্রতিজ্ঞ করিল। চঞ্চলকুমারী বলিল, “সে সকল কথা এখন থাকৃ। আমার সঙ্গে আমার একটি চেনা লোক নাই। আত্মীয়-স্বজন কেহ নাই । আমি এ অবস্থায় এখানে থাকিতে পারি না । যদি ভগবান তোমাকে মিলাইয়াছেন, তবে আমি তোমাকে ছাড়িব না। তোমাকে আমার কাছে থাকিতে হুইবে ।” শুনিয়া প্রথমে নিৰ্ম্মলের বোধ হইল, যেন বুকের উপর পাহাড় ভাঙ্গিয়া পড়িল। এই সে সবে স্বামী পাইয়াছে—নুতন প্রণয়, নুতন মুখ, এ সব ছাড়িয়া কি চঞ্চলকুমারীর কাছে আসিয়া থাকা যায় ? নিৰ্ম্মলকুমারী হঠাৎ সম্মত হইতে পারিল না—কোন মিছা ওজর করিল না—কিন্তু আসল কথা ভাঙ্গিয়াও বলিতে পারিল না । বলিল, “ও বেলা বলিব ।” চঞ্চলকুমারীর চক্ষে একটু জল আসিল ; মনে মনে বলিল, “নিৰ্ম্মলও আমায় ত্যাগ করিল ! হে ভগবান! তুমি যেন আমায় ত্যাগ করিও না।”