পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৬৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ নিৰ্ম্মল আসিয়াছিল, চঞ্চলকুমারীর পত্র লইয়া আসিয়াছিল, তাহ বলিল । পরে দিল্লীতে আসিয়া যে প্রকার বিপদে পড়িয়াছিল, তাহ বলিল, ষে প্রকারে উদ্ধার পাইল, যে কৌশলে মহালমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল, তাহা বলিল। পরে চঞ্চলকুমারী উদিপুরীর জন্য যে পত্ৰ দিয়াছিলেন, তাহা দিল । শেষ বলিল, “এই পত্র কি প্রকারে উদিপুরী বেগমের কাছে পৌছাইতে পারিব, সেই উপদেশ পাইবার জন্যই আপনার কাছে আসিয়াছি।” . রাজমহিষী বললেন, “তাহার কৌশল আছে। জেব-উন্নিসা বেগমের হুকুমের সাপেক্ষ । তাহা এখন চাহিতে গেলে গোলযোগ হইবে, রাত্রে যখন এই পাপিষ্ঠার শরাব খাষ্টয়া বিহবল হইবে, তখন সে উপায় হুইবে । এখন তুমি আমার হিন্দু বাদাদিগের মধ্যে থাক । হিন্দুর অন্নজল খাইতে পাইবে ।” নিৰ্ম্মলকুমারী সম্মত হইলেন । বেগম সেইরূপ আজ্ঞ। প্রচার করিলেন । চতুর্থ পরিচ্ছেদ সমিধ সংগ্ৰহ—উদিপুরী রাত্রি একটু বেশী হইলে যোধপুরী বেগম নিৰ্ম্মলকে উপযুক্ত উপদেশ দিয়া, এক জন তুকী (তাতার ) প্রহরিণী সঙ্গে দিয়া জেবাউন্নিসার কাছে পাঠাইয়া দিলেন, নিৰ্ম্মল জেব-উন্নিসার কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়া আতর গোলাপের, পুষ্পরাশির এবং তামাকুর সূদগন্ধে বিমুগ্ধ হইল । নানাবিধ রত্বরাজিখচিত হম্ম্যতল, শষ্যাভরণ এবং গৃহাভরণ দেখিয় বিস্মিত হইল । সৰ্ব্বাপেক্ষা জেব-উন্নিসার বিচিত্র, রত্বপুষ্পমিশ্রিত অলঙ্কারপ্রভায়, চন্দ্রস্থৰ্য্য-তুল্য উজ্জল সৌন্দৰ্য্যপ্রভায় চমকিত হইল । এই সকলে সজ্জিত পাপিষ্ঠ। জেব উন্নিসাকে দেবলোকবাসিনী অপ্সরা বলিয়া যোধ হইতে লাগিল । কিন্তু অঙ্গরার তখন চক্ষু ঢুলু ঢুলু ; মুখ রক্তবর্ণ ; চিত্ত বিভ্রান্ত ; দ্রাক্ষাসুধার তখন পূর্ণাধিকার । নিৰ্ম্মলকুমারী তাহার সম্মুখে দাড়াইলে, তিনি জড়িত রসনায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে তুই ?” নিৰ্ম্মলকুমারী বলিল, “আমি উদয়পুরের রাজমহিষীর দূতী।” জেব । মোগল-বাদশাহের ষাইতে আসিয়াছিস ? নি। না, চিঠি লইয়া আসিয়াছি। ভক্তেতাউস লইয়া CŞ জেব। চিঠি কি হইবে ? পুড়াইয়া রোশনাই করিৰি ? নিৰ্ম্মল । না, উদিপুরী বেগম সাহেবকে দিব । জেব । সে বঁাচিমা আছে, না মরিয়া গিয়াছে ? নিৰ্ম্মল । বোধ হয়, বাচিয়া আছেন । জেব । না, সে মরিয়া গিয়াছে । এ দাসীটাকে কেহ তাহার কাছে লইয়া যা । জেব-উন্নিসার উন্মত্ত প্রলাপ-বাক্যের উদেখা যে, ' ইহাকে যমের বাড়ী পাঠাইয়া দাও । কিন্তু তাতারী প্রহরিণী তাহা বুঝল না । সাদা অর্থ বুঝিয়া নিৰ্ম্মলকুমারীকে উদিপুরী বেগমের কাছে লইয়াগৈল । সেখানে নিৰ্ম্মল দেখিল, উদিপুরীর চক্ষু উজ্জল, হাস্ত উচ্চ, মেজাজ বড় প্রফুল্ল । নিৰ্ম্মল খুব একটা বড় সেলাম করিল । উদিপুর জিজ্ঞাসা করিল, “কে আপনি ?” - নিৰ্ম্মল উত্তর করিল, “আমি উদয়পুরের রাজমহিষীর দূতা। চিঠি লইয়। আসিয়াছি।” উদিপুরী বলিল, “না না । তুমি ফাসী মুলুকের বাদশাহ । মোগল-বাদশাহের হাত হইতে আমাকে কাড়িয়া লইতে আসিয়াছ ” নিৰ্ম্মলকুমারা হাসি সামলাইয়া চঞ্চলের পত্ৰখানি উদিপুরীর হাতে দিল। উদিপুরী তাহ পড়িবার ভাণ করিয়া বলিতে লাগিলেন, “কি লিখিতেছে ? লিখিতেছে, “অয় নাজনী ! পিয়ারে মেরে ! তোমার মুরৎ ও দৌলত শুনিয়া আমি একেবারেই বেহোস ও দেওয়ানা হইয়াছি। তুমি শীঘ্ৰ আসিয়া আমার কলিজা ঠাণ্ডা করিবে । আচ্ছা, তা করিব । হুজুরের সঙ্গে আলবৎ যাইব । আপনি একটু অপেক্ষ। করুন-আমি একটু শরাব খাইয়া লই । আপনি । একটু শরাব মোলাহেজা করিবেন ? আচ্ছ শরাব!’ ফেরেঙ্গের এলচি ইহা নজর দিয়াছে। এমন শরাৰ আপনার মুলুকেও পয়দা হয় না।” উদিপুরী পিয়ালা মুখে তুলিলেন, সেই অবসরে নিৰ্ম্মলকুমারী বহির্গত হইয়া যোধপুরী বেগমের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং যোধপুরীর জিজ্ঞাসামত যেমন যেমন ঘটিয়াছিল, তাহ বলিল । শুনিয়া যোধপুরী বেগম হাসিয়া বলিল, “কাল পত্র, খানা ঠিক হইয়া পড়িবে । তুমি এই বেল পলায়ন কর । নচেৎ কাল একটা গণ্ডগোল হইতে পারে। আমি তোমার সঙ্গে এক জন বিশ্বাসী খোজা দিতেছি । সে তোমাকে মহলের বাহির করিয়া । তোমার স্বামীর শিবিরে পৌঁছাইয়া দিবে। সেগুনে যদি তোমার আত্মীয়স্বজন কাহাকেও পাও"