পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৮২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ সেনা ফিরাইবার ঘুরাইবার স্থান নাই এবং সময়ও পাওয়া যাইবে না। কেন না, সেনার মুখ ফিরাইতে না ফিরাইতে রাজসিংহ পৰ্ব্বত হইতে অবতরণ পূৰ্ব্বক র্তাহার সেনা দুই খণ্ডে বিভক্ত করিয়া এক এক খণ্ড পৃথক্ করিয়া বিনষ্ট করিতে পারেন । এরূপ যুদ্ধে সাহস করা অকৰ্ত্তব্য । তার পর, এমন হইতে পারে, রাজসিংহ যুদ্ধ না করিতেও পারেন । নির্বিঘ্নে ঔরঙ্গজেবকে যাইতে দিতেও পারেন । তাহা হইলে আরও বিপদ । . তাহা হইলে ঔরঙ্গজেব চলিয়া গেলে রাজসিংহ পৰ্ব্বভাবতরণ করিয়া ঔরঙ্গজেবের পশ্চাদগামী হইবেন ৷ হইলে, তিনি ষে মোগলের পশ্চাদ্বত্তী মাল, আসবাব লুঠপট ও সেনা ধ্বংস করিবেন, সে-ও ক্ষুদ্র কথা । আসল কথা, রসদের পথ বন্ধ হইবে । সম্মুখে কুমার জয়সিংহের সেন । রাজসিংহের সেনা ও জয়সিংহের সেনা উভয়ের মধ্যে পড়িয়া, ফঁাদের ভিতর প্রবিষ্ট মূমিকের মত দিল্লীর বাদশাহ সসৈন্তে নিহত হইবেন । ফলে দিল্লীশ্বরের অবস্থা জালনিবদ্ধ রোহিতের মত,—কোনমতেই নিস্তার নাই । করিতে পারেন, কিন্তু ভাহা হইলে রাজসিংহ তাহার পশ্চাদ্বী হইবেন। তিনি উদয়পুরের রাজ্য অতল জলে ডুবাইতে আসিয়াছিলেন,- সে কথা দূরে থাকুক, এখন উদয়পুরের রাজা তাহার পশ্চাৎ করতালি দিতে দিতে ছুটিবে, পৃথিবী হাসিবে । মোগল বাদশাহের অপরিমিত গৌরবের পক্ষে ইহার অপেক্ষ অবনতি আর কি হইতে পারে ? ঔরঙ্গজেব ভাবিলেন--সিংহ হইয়া মুষিকের ভয়ে পলাইব ? কিছুতেই পলায়নের কথাকে মনে স্থান দিলেন না । তখন আর কি হইতে পারে? একমাত্র ভরসা- উদয়পুরে যাইবার যদি অন্য পথ থাকে । ঔরঙ্গজেবের আদেশে চারিদিকে অশ্বারোহী পদাতি অন্ত পথের সন্ধানে ছুটিল। ঔরঙ্গজেব নিৰ্ম্মলকুমারীকেও জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন। নিৰ্ম্মলকুমারী বলিল, “আমি পরদানিশীন স্ত্রীলোক –পথের কথা আমি কি জানি ?” কিন্তু অল্পকালমধ্যে সংবাদ আসিল—যে, উদয়পুর যাইবার আর একটা পথ আছে। এক জন ఫి সওদাগরের সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়াছে, সে পথ দেখাইয়া দিবে। এক জন মনসবদার সে পথ দেখিয়া আসিয়াছে। সে একটি পাৰ্ব্বত্য রন্ধ-পথ ; অতিশয় সঙ্কীর্ণ। কিন্তু পথটা সোজা পথ, শীঘ্র বাহির হওয়া যাইবে । সে দিকে কোন রাজপুত দেখা যাইতেছে না । যে মোগল সংবাদ দিয়াছে, সে বলিতেছে যে, সে দিকে কোন রাজপুত সেনা নাই । তিনি প্রত্যাবর্তন" ግፃ ঔরঙ্গজেব ভাবিলেন - বলিলেন, “নাই, কিন্তু লুকাইয়া থাকিতে পারে।” যে মনসবদার পথ দেখিয়া আসিয়াছিল—বখত খী—সে বলিল ষে, “যে মোগল আমাকে প্রথমেই এই ; পথের সন্ধান দেয়, তাহাকে আমি পৰ্ব্বতের উপরে পাঠাইয়া দিয়াছি । সে যদি রাজপুত সেনা দেখিতে পায়, তবে আমাকে সঙ্কেত করিবে ।” ঔরঙ্গজেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে কি আমার সিপাহী ?” বখ ত থ । না, সে এক জন সওদাগর । উদয়পুরে শাল বেচিতে গিয়াছিল। এখন শিবিরে বেচিতে আসিয়াছিল । ঔরঙ্গ। ভাল, সেই পথেই তবে ফৌজ লইয়। যাও । - তখন বাদশাহী হুকুমে ফৌজ ফিরিল । ফিরিল —কেন না, কিছু পথ ফিরিয়া আসিয়া তবে রন্ধ্রপথে প্রবেশ করিতে হয় । ইহাতেও বিশেষ বিপদ-তবে জালনিবদ্ধ বৃহৎ রোহিত আর কোন দিকে যায় ? যেরূপ পারম্পর্যের সহিত মোগল-সেনা আসিয়াছিল -- তাহা অার রক্ষিত হইতে পারিল না । যে ভাগ আগে ছিল, তাহ! পিছে পড়িল ; ষাহ পিছনে ছিল, তাহা গাগে চলিল। সেনার তৃতীয় ভাগ আগে আগে চলিল । বাদশাহ হুকুম দিলেন যে, তাম্বু ও মোট-ঘাট এবং বাজে লোক সকল এক্ষণে উদয়সাগরের পথে যাক --পরে সেনার পশ্চাতে তাহারা আসিবে । তাহাই হুইল । ঔরঙ্গজেব নিজে পদাতি ও ছোট কামান ও গোলন্দাজ সেনা লইয়া, রন্ধ্রপথে চলিলেন । আগে আগে বখত খা । দেখিয়া, রাজসিংহ সিংহের মত লাফ দিয়া, পৰ্ব্বত হইতে অবতরণ করিয়া মোগলসেনার মধ্যে পড়িলেন । অমনই মোগলসেনা দ্বিখণ্ড হইয়া গেল—ছুরিকাঘাতে যেন ফুলের মাল কাটিয়া গেল । এক ভাগ ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে রন্ধমধ্যে প্রবিষ্ট ; আর এক ভাগ এখন পূৰ্ব্ব পথে, কিন্তু রাজসিংহের সম্মুখে । মোগলের বিপদের উপর বিপদ এই ষে, যেখানে হাতী,ঘোড়া, দোলার উপর বাদশাহের পৌরাঙ্গনাগণ, ঠিক সেইখানে, পৌরাঙ্গনাদিগের সম্মুখে রাজসিংহ সসৈন্তে অবতীর্ণ হইলেন । দেখিয়া, যেমন চিল পড়িলে চড়াইয়ের দল কিল-কিল করিয়৷ উঠে, এই সসৈন্য গরুড়কে দেখিয়া, রাজাবরোধের কালভূজঙ্গীর দল তেমনই আৰ্ত্তনাদ করিয়া উঠিল । এখানে যুদ্ধের নামমাত্র হইল না । যে সকল আহুদীয়ান তাহাঁদের প্রহরায় নিযুক্ত ছিল—তাহার কেহই অস্ত্রসঞ্চালন