পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৮৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ মাণিকলাল তাহাই করিল। নিৰ্ম্মলকুমারী যোধপুরীর হাতীর উপর উঠয় তাহার ইন্দ্রাসনতুল্য হাওদার ভিতর প্রবেশ করিল। যোধপুরী বলিলেন, “আমাকে তোমাদের সঙ্গে লইয়া চল ।” নি। কেন মা ? 睡 যোধপুরী। কেন, তা ত কতবার বলিয়াছি । আমি এ স্লেচ্ছপুরীতে, এ মহাপাপের ভিতর আর থাকিতে পারি না । নিৰ্ম্মল । তাহা হইবে না। তোমার যাওয়া হইবে না । আজ যদি মোগলসাম্রাজ্য টিকে, তবে তোমার ছেলে দিল্লীর বাদশাহ হইবে। আমরা সেই চেষ্টা করিব । র্তার রাজত্বে আমরা সুখে থাকিব । যোধপুরী । অমন কথা মুখে আনিও না, বাছা। বাদশাহ শুনিৰে, আমার ছেলে এক দিনও বাচিবে না। বিষপ্রয়োগে তাহার প্রাণ যাইবে । নিৰ্ম্মল। এখনকার কথা বলিতেছি না । যাহা শাহজাদার হক, কালে তিনি পাইবেন । আপনি আমাকে আর কোন আজ্ঞা করিবেন না । আপনি যদি আমার সঙ্গে এখন যান, আপনার পুত্রের অনিষ্ট হইতে পারে। যোধপুরী ভাবিয়া বলিল, “সে কথ। সত্য, তোমার কথাই শুনিলাম। আমি যাইব না। তুমি যাও।” নিৰ্ম্মলকুমারী তখন তাহাকে প্রণাম করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন । উদিপুরী এবং জেব উন্নিসা উপযুক্ত সৈন্তে বেষ্টিতা হইয়া নিৰ্ম্মলকুমারীর সহিত উদয়পুরে চঞ্চলকুমারীর নিকট প্রেরিত হইলেন । চতুর্থ পরিচ্ছেদ অগ্নিচক্র বড় ভীষণ হুইল তখন রাজসিংহ আর সকল পৌরাঙ্গনাকে— গজারূঢ়া, শিবিকারূঢ়া এবং অশ্বারূঢ়া—সকলকেই, ঔরঙ্গজেব যে রন্ধ্রপথে প্রবেশ করাইয়াছিলেন, সেই পথে প্রবেশ করিতে দিলেন। তাহার প্রবেশ করিলে পর, উভয় সেন নিস্তব্ধ হইল। ঔরঙ্গজেবের অবশিষ্ট সেনা অগ্রসর হইতে পারিতেছে না—কেন না, রাজসিংহ পথ বন্ধ করিয়া বসিয়াছেন । কিন্তু ঔরঙ্গজেবের সাগরতুল্য অশ্বারোহী সেনা যুদ্ধের উদ্যোগ করিতে লাগিল। তাছারা ঘোড়ার মুখ ফিরাইয়া রাজপুতের সন্মুখীন হইল। তখন אף , রাজসিংহ একটু হঠিয়া গিয়া তাঁহাদেৱ । পথ ছাড়িয়া দিলেন—তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিলেন । না। তাহারা "দীন দীন’ শব্দ করিতে করিতে বাদশাহের আজ্ঞানুসারে, বাদশাহ যে সঙ্কীর্ণ রন্ধ্রপথে প্রবেশ করিয়াছিলেন, সেই পথে প্রবেশ করিল ৷ রাজসিংহ আবার আগু হইলেন । তারপর বাদশাহী তোষাখানা আসিয়া উপস্থিত হইল রক্ষক নাই বলিলেই হয়, রাজপুতের . তাহা লুঠিয়া লইল । তার পর খাদ্যদ্রব্য । যাহা হিন্দুর ব্যবহার্য্য, তাহ রাজসিংহের রসদের সামিল হইল । যাহা হিন্দুর অব্যবহার্য্য, তাহ ডোম-দোসাদে লইয়া গিয়া কতক খাইল, কতক পৰ্ব্বতে ছড়াইল— শৃগাল, কুঙ্কুর এবং বন্যপশুতে খাইল । রাজপুতের। দপ্তরখানা হাতীর উপর হইতে নামাইল—কতক বা পুড়াইয়া দিল, কতক বা ছাড়িয়া দিল । তার পর মালখানা—তাহাতে যে ধনরত্নরাশি আছে, পৃথিবীতে এমন আর কোথাও নাই,- জানিতে পারিয়া রাজপুত সেনাপতিগণ লোভে উন্মত্ত হইল। তাহার পশ্চাতে বড় গোলন্দাজ সেনা । রাজসিংহ আপন সেনা সংযত করিলেন। বলিলেন, “তোমরা ব্যস্ত হইও না । ও সব তোমাদেরই । আজ ছাড়িয়া দাও । আজ এখন যুদ্ধের সময় নহে ।” রাজসিংহ নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন । ঔরঙ্গজেবের সমস্ত সেন রন্ধ্রপথে প্রবেশ করিল। তার পর মাণিকলালকে বিরলে লইয়া গিয়া বলিলেন, “আমি সেই মোগলের উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। এতটা সুবিধা হইবে, আমি মনে করি নাই । আমি যাহা অভিপ্রেত করিয়াছিলাম, তাহাতে যুদ্ধ করিয়া মোগলকে বিনষ্ট করিতে হইত। এক্ষণে বিনা যুদ্ধে মোগলকে বিনষ্ট করিতে পারিব । মবারককে আমার নিকট লইয়া আসিবে। আমি তাহাকে সমাদর করিব ।” পাঠকের স্মরণ থাকিতে পারে, মবারক মাণিকলালের হাতে জীবন পাইয় তাহার সঙ্গে উদয়পুর আসিয়াছিলেন। রাজসিংহ ৰ্তাহার বীরত্ব অবগড় ছিলেন, অতএব তাহাকে নিজ সেনামধ্যে উপযুক্ত পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু মোগল বলিয় তাহাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতেন না। তাহাতে মবারক কিছু দুঃখিত ছিল । আজ সেই দুঃখে গুরুতর কার্য্যের ভার লইয়াছিল । সে গুরুতর কার্য্য যে সুসম্পন্ন হইয়াছে, তাহা পাঠক দেখিয়াছেন। পাঠক বুঝিয়া থাকিবেন ষে, মবারকই ছদ্মবেশী মোগল সওদাগর । মাণিকলাল আজ্ঞা পাইয়া মবারককে লইয়া আসিলেন। রাজসিংহ মবারকের অনেক প্রশংসা