পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৮৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


*8 চঞ্চলকুমারী আজ্ঞা দিলেন যে, আর কেহ কোন প্রকারে বেগমের অসম্মান না করে । আহারাদি, শয়ন ও পরিচর্য্যা সম্বন্ধে চঞ্চলকুমারীর নিজের যেরূপ বন্দোবস্ত, বেগম সম্বন্ধে ততোধিক যাহাতে হয়, তাহ করিতে চঞ্চলকুমারী নিৰ্ম্মলকুমারীকে আদেশ করিলেন । নিৰ্ম্মল বলিল, “তাহ৷ সবই হইবে । কিন্তু তাহাতে ইহার পরিতৃপ্তি হইবে না।” চঞ্চল। ইকন, আর কি চাই ? নিৰ্ম্মল । তাহা রাজপুরীতে অপ্রাপ্য। চঞ্চল। সরাব ? যখন তাহ চাহিবে, তখন একটু গোময় দিও। উদিপুরী পরিচর্য্যায় সন্তুষ্ট হইলেন । কিন্তু রাত্রিকালে উপযুক্ত সময় উপস্থিত হ’লে, উদপুরী নিৰ্ম্মল কুমারীকে ডাকাইয়া মিনতি করিয়া বলিলেন, “ইম্লি বেগম-থোড়া সরাব হুকুম কি জিয়ে ” নিৰ্ম্মল “দিতেছি” বলিয়। রাজবৈদ্যকে গোপনে সংবাদ পাঠাইলেন। রাজবৈদ্য এক বিন্দু ঔষধ পাঠাইয়া দিলেন, এবং উপদেশ দিলেন যে, সরবৎ প্রস্তুত করিয়া এই ঔষধবিন্দু তাহাতে মিশাইয়া, সূরাব বলিয়া পান করিতে দিবে। নিৰ্ম্মল তাহাক্ট করাইলেন । উদিপুরী তাহ পান করিয়া, অতিশয় প্রীত হইলেন । বলিলেন, “অতি উৎকৃষ্ট মদ্য;" এবং অল্পকালমধ্যেই নেশায় অভিভূত হইয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন হক্টলেন । চতুর্থ পরিচ্ছেদ জেব-উন্নিসার দাহনারম্ভ জেব উল্লিসী এক বসিয়া আছেন । দুই এক জন পরিচারিক তাহার তত্ত্বাবধান করিতেছে । নিৰ্ম্মলকুমারীও দুই একবার তাহার খবর লইতেছেন। ক্রমশঃ জেব উল্লিস উদিপুরীব বিভ্রাটবাৰ্ত্ত শুনিলেন । শুনিয়া তিনি নিজের জন্য চিন্তিত হইলেন । পরিশেষে তাহাকেও নিৰ্ম্মলকুমারী চঞ্চলকুমারীর নিকট লইয়া গেলেন । তিনি না বিনীত ন গৰ্ব্বিতভাবে চঞ্চলকুমারীর নিকট উপস্থিত হইলেন । মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন, আমি ষে আলমগীর বাদশাহের কন্যা, তাহা কিছুতেই ভুলিব না । চঞ্চলকুমারী অতিশয় সমাদরের সহিত র্তাহাকে উপযুক্ত পৃথক আসনে বসাইলেন এবং নানাবিধ আলাপ করিলেন। জেবউন্নিসাও সৌজন্যের সহিত কথার উত্তর করিলেন । পরস্পরে বিদ্বেষভাব জন্মে, o ہء - এমন কথা কেহ কিছুই বললেন না । পরিশেষে চঞ্চলকুমারী তাহার উপযুক্ত পরিচর্য্যার আদেশ দিলেন এবং জেব উন্নিসাকে আতর ও পান দিলেন । কিন্তু জেব উন্নিসা না উঠিয়া বলিলেন, “মহারাণি ! আমাকে কেন এখানে আনা হইয়াছে, আমি কিছু । শুনিতে পাই কি ?” চঞ্চল । সে কথা আপনাকে বলা হয় নাই । নী বলিলেও চলে । কোন দৈবজ্ঞের আদেশমত আপনাকে আনা হইয়াছে । আপনি অদ্য এক শয়ন কৱিবেন। দ্বার খুলিয়া রাখিবেন। প্রহরিণীগণ অলক্ষ্যে প্রহরা দিবে,আপনার কোন অনিষ্ট ঘটবে না । দৈবজ্ঞ বলিয়াছেন, আপনি আজ রাত্রে কোন স্বপ্ন দেখিবেন । যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে আমাকে কাল তাহ বলিবেন, ইহ। আপনার নিকট প্রার্থনা । শুনিয়া চিন্তিতভাবে জেব উন্নিসা চঞ্চলকুমারীর নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন । নিৰ্ম্মলকুমারীর যত্নে তাহার অহোর, শয্যা ও শয্যার পারিপাট্য যেমন দিল্লীর রঙ মহালে ঘটিত, তেমনই ঘটিল। তিনি শয়ন করিলেন, কিন্তু নিদ্র। যাক্টলেন না। চঞ্চঙ্গকুমারীর আজ্ঞামত দ্বার পৃলিয়া রাখিয়া একাই শয়ন করিলেন, কেন না, অবাধ্য হইলে যদি চঞ্চল কুমারী উদিপুরীর দশার মত র্তাহারও কোন দুর্দশ ঘটান, সে ভয়ও ছিল । কিন্তু এক সমস্ত রাত্রি দ্বার খুলিয়া রাখাতেও অতান্ত শঙ্কা উপস্থিত হইল। মনে ভাবিলেন যে, ইহাই সম্ভব যে, গোপনে আমার উপর কোন অত্যাচার হইবে, এই জন্য এমন বন্দোবস্ত হইয়াছে । অতএব স্থির করিলেন, নিদ্রা যাইবেন না, সতর্ক থাকিবেন কিন্তু দিবসে অনেক কষ্ট গিয়াছিল, এজন্য নিদ্র যাইব না, জেব উন্নিসা এরূপ প্রতিজ্ঞ করিলেও তন্দ্রা আসিয়৷ মধ্যে মধ্যে ঠাহাকে অধিকার করিতে লাগিল । সে নিন্দ যাইব না, প্রতিজ্ঞা করে, তন্দ্ৰ আসিলেও মধ্যে মধ্যে নিদ্রাভঙ্গ হয় ; তন্দ্রাভিভূত হইলেও একটু বোধ থাকে যে, আমার ঘুমান হইবে না। জেবউন্নিসা মধ্যে মধ্যে এইরূপ তন্দ্রাভিভূত হুইতেছিলেন । কিন্তু মধ্যে মধ্যে চমকে চমকে ঘুম ভাঙ্গিতেছিল। ঘুম ভাঙ্গিলেই আপনার অবস্থা মনে পড়িতেছিল । কোথায় দিল্লীর বাদশাহজাদী, কোথায় উদয়পুরের বন্দিনা ! কোথায় মোগল বাদশাহীর রঙ্গভূমির প্রধান অভিনেত্রী, মোগল বাদশাহীর আকাশের পূর্ণচন্দ্র, তক্তে তাউসের সৰ্ব্বোজ্জল রত্ন, কাবুল হইতে বিজয়পুর গোলকুণ্ডা র্যাহার বাহুবলে শাসিত, তাহার দক্ষিণবাহু,—আর কোথায় আজ গিরিগুহা-নিহিত