পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৯৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


سنسb উত্তর হইল, “কার ?” জেব-উন্নিসা বলিল, “কার ! যে বেহেস্তে গিয়াছে, তারও কি কণ্ঠস্বর আছে ? সে কি ছায়া-মাত্র নহে ? তুমি কি প্রকারে বেহেস্ত হইতে আসিতেছ, যাইতেছ, মবারক ? তুমি কাল দেখা দিয়াছিলে, আজ তোমার কথা শুনিলাম –তুমি মৃত না জীবিত ? আসিরদান কি আমার কাছে মিছা কথা বলিয়াছিল ? তুমি জীবিত হও, মৃত হও, তুমি আমার কাছে—আমার এই পালঙ্কে মূহূৰ্ত্ত জন্য বসিতে পার না ? তুমি যদি ছায়ামাত্রই হও, তবু আমার ভয় নাই । একবার বসে৷ ” উত্তর কেন ?” জেব উন্নিসা সকাতরে বলিল, “আমি কিছু বলিব। আমি যাহা কখন বলি নাই, তাহ বলিব ।” মবারক--( বলিতে হইবে ন যে, মবারক সশরীর উপস্থিত) তখন অন্ধকারে, জেব উল্লিসার পাশ্বে পালঙ্কের উপর বসিল । জেব উল্লিসার বাহুতে তাহার বাহু স্পর্শ হইল,—জেব-উন্নিসার শরীর হর্ষ কণ্টকিত, আহলাদে পরিপ্লুত হইল ;–অন্ধকারে মুক্তার সারি গণ্ড দিয়া বহিল। জেব উল্লিস আদরে মবারকের হাত আপনার হাতের উপর তুলিয়ু লইল । বলিল, “ছায়া নও প্রাণনাথ ! আমায় তুমি যা বলিয়া ভুলাও, আমি ভুলিব না। আমি তোমার ; আর তোমায় ছাড়িব না ।” তখন জেব উন্নিসা সহসা পালঙ্ক হইতে নামিয়া, মবারকের পায়ের উপর পড়িল, বলিল, “আমায় ক্ষম। কর । আমি ঐশ্বৰ্য্যের গৌরবে পাগল হইয়াছিলাম। আমি আজ শপথ করিয়া ঐশ্বৰ্য্য ত্যাগ করিলাম - তুমি যদি আমায় ক্ষমা কর, আমি আর দিল্লী ফিরিয়! যাইব না । বল, তুমি জীবিত ?” মবারক দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “আমি জীবিত ৷ এক জন রাজপুত আমাকে কবর হইতে ভুলিয়া চিকিৎসা করিয়া প্রাণদান দিয়াছিল, তাহারই সঙ্গে আমি এখানে আসিয়াছি।” জেব উন্নিসা পা ছাড়িল না। তাহার চক্ষুর জলে মবারকের পা ভিজিয়া গেল । মবারক তাহার হাত ধরিয়া উঠাইতে গেল। কিন্তু জেব উল্লিস উঠিল না, বলিল, “আমায় দয়া কর, আমায় ক্ষমা কর ।” মবারক বলিল, “তোমায় ক্ষমা করিয়াছি। না করিলে তোমার কাছে আসিতাম না ।” জেবউন্নিসা বলিল, “যদি আসিয়াছ, যদি ক্ষমা করিয়াছ, তবে অামায় গ্রহণ কর । গ্রহণ করিয়৷ ইচ্ছা হয়, আমাকে সাপের মুখে সমৰ্পণ কর, না ইচ্ছ বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী হয়, যাহা বল, তাহাই করিব। আমায় আর ত্যাগ করিও না। আমি তোমার নিকট শপথ করিতেছি যে, আর দিল্লী যাইতে চাহিব না ; আলমগীর বাদশাহের রঙ মহালে আর প্রবেশ করিব না। আমি শাহজাদা বিবাহ করিতে চাহি না । তোমার সঙ্গে যাইব ।” মবারক সব ভুলিয়া গেল—সর্পদংশনের জ্বালা ভুলিয়া গেল, আপনার মরিবার ইচ্ছা ভুলিয়া গেল— দরিয়াকে ভুলিয়া গেল। জেব-উল্লিসার প্রতিশূন্ত অসহ বাক্য ভুলিয়া গেল । কেবল জেব-উন্নিসার অতুল রূপরাশি তাহার নয়নে লাগিয়া রহিল ; জেবউল্লিসার প্রেম-পরিপূর্ণ কাতরোক্তি তাহার কর্ণম-ধ্য ভ্ৰমিতে লাগিল ; শাহজাদার দর্প চুণিত দেখিয়। তাহার মন গলিয়া গল । তখন মবারক জিজ্ঞাসা করিল, “তুম কি এখন এই গরীবকে স্বামী বলিয়। গ্রহণ করিতে সম্মত ?” হেব উল্লিস যুক্তকরে, সঙ্গলনয়নে বলিল, “এত ভাগ্য কি আমার হইবে ?” - বাদশাহজাদী আর বাদশাহজাদী নহে, মানুষী মাত্র । মবারক বলিল, “তবে নিৰ্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে আমার সঙ্গে আইস ।” আলো জালিবার সামগ্ৰী তাহার সঙ্গে ছিল । মবারক আলো জালিয়া ফামুষের ভিতর রাখিয়া বাহিরে আসয়া দাড়াইলেন । তাহার কথামত জেব,উল্লিসা বেশ-ভূষা করিলেন, তাহ সমাপন হইলে, মবারক তাহার হাত ধরিয়া লইয়া কক্ষের বাহিরে গেলেন । তথায় প্রহরিণীগণ নিযুক্ত ছিল । তাহারা মবারকের ইঙ্গিতে দুইজনে মবারক ও জেব-উন্নিসার সঙ্গে চলিল। মবারক যাইতে যাইতে জেবাউন্নিসাকে বুঝাইলেন যে, রাজাবরোধমধ্যে পুরুষের আসিবার উপায় নাই । বিশেষ মুসলমানের ত কথাই নাই । এই জন্য তিনি রাত্রিতে আসিতে বাধ্য হইয়াছেন । তাও মহারাণীর বিশেষ অনুগ্রহেই পারিয়াছেন, এবং তাই এই প্রহরিণীদিগের সাহায্য পাইয়াছেন । সিংহদ্বার পর্য্যস্ত র্তাহীদের হাটিয়া যাইতে হুইবে । বাহিরে মবারকের ঘোড়া এবং জেব উন্নিসার জন্য দোলা প্রস্তুত আছে । প্রহরিণীদিগের সাহায্যে সিংহদ্বারের বাছির হইয়া র্তাহারা উভয়ে স্ব স্ব যানে আরোহণ করিলেন । উদয়পুরেও দুই চারি জন মুসলমান সওদাগরী ইত্যাদি উপলক্ষে বাস করিত, তাহার রাণার অনুমতি লইয়৷ নগরপ্রান্তে একটি ক্ষুদ্র মসজীদ নিৰ্ম্মাণ করিয়াছিল। মবারক জেব-উন্নিসাকে সেই মসজীদে লইয়া গেলেন।