পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৯৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ তাহাতে সন্তুষ্ট হইলেন । এ দিকে মাণিকলাল মবারককে সকল কথা জানাইলেন । মবারক কিছু বলিল না । মাণিকলাল তাঙ্গাকে সতর্ক করিবার জন্ত বলিল, “সাহেব ! বাদশাহের নিকট ফিরিয়া গেলে, তিনি যে আপনাকে যথার্থ মার্জনা করিবেন, এমন ভরসা আমি করি না ।" মবারক বলিল, “নাই করুন ।” পরদিন প্রাতে মাণিকলাল নিৰ্ম্মলকুমারীর পায়রা চাহিয়া লইয়া গিয়া, পত্রগুলি কাটিয়া ছোট করিয়া তাহার পায়ে বাধিয়া দিল । পায়রা ছাড়িয়া দিবীমাত্র সে আকাশে উঠিল । পায়ের ভরে বড় পীড়িত । তথাপি কোনমতে উড়িয়া যেখানে ঔরঙ্গজেব উৰ্দ্ধমুখে আকাশ নিরীক্ষণ করিতেছিলেন, সেইখানে বাদশাহের কাছে পত্র পৌছাইয়া দিল। দশম পরিচ্ছেদ অগ্নিনিৰ্ব্বাণকালে উদিপুরী ভস্ম কপোত শীঘ্রই ঔরঙ্গজেবের উত্তর লইয়া আসিল । রাজসিংহ যাহা যাহা চাহিয়াছিলেন, ঔরঙ্গজেব সকলেতেই সম্মত হইলেন । কেবল একটা গোলযোগ করিলেন, লিখিলেন, “চঞ্চলকুমারীকে দিতে হইবে।” রাজসিংহ বলিলেন, "তদপেক্ষ আপনাকে ঐখানে সসৈন্তে কবর দেওয়া আমার মনোমত " কাজেই ঔরঙ্গজেবকে সে বাসনা ছাড়িতে হইল । তিনি সন্ধিতে সম্মত হইয়া মুনশীর দ্বারা সেই মৰ্ম্মে সন্ধিপত্র লেখাইয়৷ আপনার পাঞ্জ অঙ্কিত করিয়া স্বহস্তে তাহাতে "মঞ্জুর” লিখিয়া দিলেন । জেব উন্নিসা ও মবারক সম্বন্ধে .একখানি পৃথক পত্রে তাহাদিগকে মার্জনা করিতে স্বীকৃত হইলেন, কিন্তু একটি সবৃত এই করিলেন যে, এ বিবাহের কথা কাহারও সাক্ষাতে কখন প্রকাশ করিবে না । সেই সঙ্গে ইহাও স্বীকার করিলেন যে, কন্ত যাহাতে স্বামিসনদর্শনে বঞ্চিত না হয়েন, সে উপায়ও বাদশাহ করিবেন । রাজসিংহ সন্ধিপত্র পাইয়া মোগল-সেনা মুক্তি দিবার আজ্ঞা প্রচার করিলেন । রাজপুতের হাতী লাগাইয়া গাছ সকল টানিয়া বাহির করিল। মোগলের হঠাৎ আহাৰ্য্য কোথায় পাইবে, এই জন্ত রাজসিংহ দয়া করিয়া, বহুতর হাতীর পিঠে বোঝাই দিয়া অনেক আহাৰ্য্য বস্তু উপঢৌকন প্রেরণ করিলেন এবং শেষে উদিপুরী, জেব উন্নিসা ও মবারককে তাহার নিকট পাঠাইয়। দিবার জন্য উদয়পুরে আদেশ సిరీ পাঠাইলেন । তখন নিৰ্ম্মল চঞ্চলকে ইঙ্গিত করিয়া কাণে কাণে বলিল, “বেগম তোমার দাসীপনা করিল । কৈ ?” এই বলিয়া নিৰ্ম্মল উদিপুরীকে বলিল, “আমি যে নিমন্ত্রণ করিতে দিল্লী গিয়াছিলাম, সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিলেন না ?” উদিপুরী বলিল, “তোমার জিভ আমি টুকরা টুকরা করিয়া কাটিব । তোমাদের সাধ্য কি ষে, আমাকে দিয়া তামাকু সাজাও ? তোমাদের মত ক্ষুদ্র লোকের সাধ্য কি যে, বাদশাহের বেগম আটক রাখ ? কেমন, এখন ছাড়িতে হইল ত ? কিন্তু ষে অপমান করিয়াছ, তাহার প্রতিফল দিব। উদয়পুরের চিহ্নমাত্র রাখিব ন৷ ” - তখন চঞ্চলকুমারী স্থিরভাবে বলিলেন, “শুনিয়াছি, মহারাণা বাদশাহকে দয়া করিয়া তোমাদের ছাড়িয়া দিয়াছেন। আপনি তাহার জন্য একটা মিষ্ট কথাও বলিতে জানেন না, অতএব আপনাকে ছাড়া হুইবে না। আপনি বাদীমহলে গিয়া আমার জন্য তামাকু প্রস্তুত করিয়া আনুন ।” জেব-উন্নিসা বলিল, “সে কি মহারাণি ! এত নির্দয় ?” চঞ্চলকুমারী বলিল, “আপনি বাইতে পারেন— কেহ বিঘ্ন করিবে না । ইহাকে আমি এক্ষণে যাইতে দিতেছি না ।” জেব-উন্নিসা অনেক অমুনয় করিল, শেষ উদিপুরীও কিছু বিনীতভাব অবলম্বন করিল। কিন্তু চঞ্চলকুমারী বড় শক্ত । দয়া করিয়া কেবল এইটুকু বলিলেন, “আমার জন্য একবার তামাকু প্রস্তুত করুক, তবে যাইতে পরিবে ।” তখন উদিপুরী বলিল, “তামাকু প্রস্তুত করিতে আমি জানি ন৷ ” - চঞ্চলকুমারী বলিল, “বাদীরা দেখাইয়া দিবে।” অগত্য উদিপুর স্বীকৃত হইল। বাদীরা দেখাইয়া দিল । উদিপুরী চঞ্চলকুমারীর জন্ত তামাকু সাজিল । তখন চঞ্চলকুমারী সেলাম করিয়া তাহাদের বিদায় করিলেন । বলিলেন, “এখানে যাহা যাহা ঘটিয়াছে, সমস্তই আপনি বাদশাহকে জানাইবেন এবং তঁাহাকে স্মরণ করিয়া দিবেন যে, আমিই তসৰীরে নাথি মারিয়া নাক ভাঙ্গিয় দিয়াছিলাম । আরও বলিবেন, পুনশ্চ যদি তিনি কোন হিন্দুবাল্লার অপমানের ইচ্ছা করেন, তাহ হইলে’ আমি কেবল তসবীরে পদাঘাত করিয়া সন্তুষ্ট । হুইব না ।” আপনি