পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (প্রথম ভাগ).djvu/৯৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


సి8 তখন উদিপুরী নিদাঘের মত সজল কাস্তি হইয়া বিদায় হইল । মহিষী, কন্যা ও খাদ্য পাইয়া ঔরঙ্গজেব বেত্ৰাহত কুকুরের মত বদনে লাঙ্গুল নিহিত করিয়া রাজসিংহের সম্মুখ হইতে পলায়ন করিলেন । _ একাদশ পরিচ্ছেদ অগ্নিকাণ্ডে ভূষিত চাতকী বেগমদিগকে বিদায় দিয়া চঞ্চলকুমারী আবার অন্ধকার দেখিল । মোগল ত পরাভূত হইল, বাদশাহের বেগম তাহার পরিচর্য্যা করিল ; কিন্তু কৈ, রাণা ত কিছু বলেন না । চঞ্চলকুমারী কঁাদিতেছে দেখিয়া নিৰ্ম্মল আসিয়া কাছে বসিল । মনের কথা বুঝিল । নিৰ্ম্মল বলিল, “মহারাণাকে কেন কথাটা স্মরণ করিয়া দাও না ?” চঞ্চল বলিল, “তুমি কি ক্ষেপিয়াছ ? স্ত্রীলোক হইয়া বার বার এই কথা কি বলা যায় ?” নিৰ্ম্মল । তবে রূপনগরে তোমার পিতাকে কেন আসিতে লেখ না ? চঞ্চল । কেন ? সেই পত্রের উত্তরের পর আবার পত্র লিখিব ? নিৰ্ম্মল । বাপের উপর রাগ অভিমান কি ? চঞ্চল । রাগ অভিমান নয় । কিন্তু একবার লিখিয়া—সে আমারই লেখা—যে অভিসম্পাত প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহা মনে হইলে এখনও বুক কঁাপে । আর কি লিখিতে সাহস হয় ? নিৰ্ম্মল । সে ত বিবাহের জন্ত লিখিয়াছিলে ? চঞ্চল । এবার কিসের জন্ত লিখিব ? নিৰ্ম্মল । যদি মহারাণ। কোন কথা ন পাড়িলেন —তবে বোধ করি, পিত্রালয়ে গিয়া বাস করাই ভাল,—ঔরঙ্গজেব এ দিকে আর বেসিবে না । সেই জন্ত পত্র লিথিতে বলিতেছিলাম । পিত্ৰালয় ভিন্ন আর উপায় কি ? চঞ্চল কি উত্তর করিতে যাইতেছিল । উত্তর মুখ দিয়া বাহির হইল না—চঞ্চল কাদিয়া ফেলিল । নিৰ্ম্মলও কথাটা বলিয়াই অপ্রতিভ হইয়াছিল । চঞ্চল চক্ষুর জল মুছিয়া লজ্জায় একটু হাসিল । নিৰ্ম্মলও হাসিল । তখন নিৰ্ম্মল হাসিয়া বলিল, “আমি দিল্লীর বাদশাহের কাছে কখন অপ্রতিভ হই নাই--তোমার কাছে অপ্রতিভ হইলাম--ইহ। দিল্লীর বাদশাহের পক্ষে ষড় লজ্জার কথা । ইমলি বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী

  • .

যেগমেরও কিছু লজ্জার কথা। তা তুমি একবার ইমূলি বেগমের মুনশীআনা দেখ। দোয়াতকলম লইয়া লিখিতে আরম্ভ কর-আমি বলিয়া যাইতেছি ।" চঞ্চল জিজ্ঞাসা করিল, “কাহাকে লিখিব-মাকে না বাপকে ?” নিৰ্ম্মল বলিল,—“বাপকে ৷” চঞ্চল পাঠ লিখিলে, নিৰ্ম্মল বলিয়া যাইতে লাগিল, “এখন মোগল বাদশাহ, মহারাণার হস্তে”—“বাদশাহ' পৰ্য্যন্ত লিখিয়া চঞ্চলকুমারী বলিল, “মহারাণার হস্তে” লিখিব না—“রাজপুতের হস্তে লিখিব।” নিৰ্ম্মলকুমারী ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “তা লেখ ।” তার পর নিৰ্ম্মলের কথনমতে -চঞ্চল লিখিতে লাগিল—“হস্তে পরাভব প্রাপ্ত হইয়। রাজপুতান হইতে তাড়িত হইয়াছেন । এক্ষণে আর র্তাহার আমাদিগের উপর বলপ্রকাশ করিবার সম্ভাবনা নাই । এক্ষণে আপনার সস্তানের প্রতি আপনার কি আজ্ঞা ? আমি আপনারই অধীন”— পরে নিৰ্ম্মল বলিল,—“মহারাণার অধীন নই ৷” চঞ্চল বলিল, “দূর হ পাপিষ্ঠ। " সে কথা লিখিল না । নিৰ্ম্মল বলিল, “তবে লেখ, আর কাহারও অধীন নই ।” অগত্য চঞ্চল ভাহাই লিখিল । এইরূপ পত্র লিখিত হইলে, নিৰ্ম্মল বলিল, “এখন রূপনগরে পাঠাইয়া দাও ” পত্র রূপনগরে প্রেরিত হইল । উত্তরে রূপনগরের রাও লিখিলেন, “আমি দুই হাজার ফৌজ লইয়া উদয়পুর বাইতেছি, ঘাট খুলিয়। রাখিতে রাণাকে বলিবে।" এই আশ্চৰ্য্য উত্তরের অর্থ কি, তাহা চঞ্চল ও নিৰ্ম্মল কিছুই স্থির করিতে পারিল না । পরিশেষে তাহারা বিচারে স্থির করিল যে, যখন ফৌজের কথা আছে, তখন রাণাকে অবগত করান অবিস্ত্যক । নিৰ্ম্মলকুমারী মাণিকলালের নিকট সংবাদ পাঠাইয়। দিল । রাণাও সেইরূপ গোলযোগে পড়িয়াছিলেন । চঞ্চলকুমারীকে ভুলেন নাই । তিনি বিক্রম সোলাঙ্কিকে পত্র লিখিয়াছিলেন । পত্রের মৰ্ম্ম, চঞ্চলকুমারীর বিবাহের কথা । বিক্রমসিংহ কন্যাকে শাপ দিয়াছিলেন, রাণা তাহী স্মরণ করাইয় দিলেন, আর তিনি অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, তিনি যখন রাজসিংহকে উপযুক্ত পত্রি বিবেচনা করিবেন, তখন র্তাহাকে আশীৰ্ব্বাদের সহিত কন্যা সম্প্রদান করিবেন, তাহাও স্মরণ করাইলেন। রাণা জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখন আপনার কিরূপ অভিপ্রায় ?”