পাতা:বিষাদ-সিন্ধু - মীর মোশার্‌রফ হোসেন.pdf/২১৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৯৭
মহরম পর্ব্ব—চতুর্বিংশ প্রবাহ

কিছুই নাই! আবদুল ওহাব! তুমি স্বচক্ষে শাহ্‌রেবানুর ক্রোড়স্থ সন্তানের সাংঘাতিক মৃত্যু দেখিয়াও নিশ্চিন্তভাবে বসিয়া আছ? শিশুশোকে শুধু নয়নজলই ফেলিতেছ! নিতান্ত আক্ষেপের বিষয়! বিপদে দুঃখে তোমরাই যদি কাঁদিয়া অনর্থ করিলে, তবে আমরা কি করিব? অবলা নিঃসহায় স্ত্রীজাতির জন্যই বিধাতা কান্নার সৃষ্টি করিয়াছেন, বীরপুরুষের জন্য নহে।”

 মাতার উৎসাহসূচক ভর্ৎসনায় আবদুল ওহাব তখনই সজ্জিত হইয়া আসিলেন; মাতার চরণ চুম্বন করিয়া বলিলেন, “আবদুল ওহাব আর কাঁদিবে না! তাহার চক্ষে জল আর দেখিবেন না; ফোরাত নদীর কুল হইতে শত্রুদিগকে তাড়াইয়া সে মোহাম্মদের আত্মীয়-স্বজন পরিবারদিগের জলপিপাসা নিবারণ করাইবে, আর না হয় আজ কারবালাভূমি আবদুল ওহাবের শোণিতে রঞ্জিত হইবে! কিন্তু না, এমন কঠিন প্রতিজ্ঞা পরিপূর্ণ করিবার আশায় যুদ্ধক্ষেত্রে গমন সময়ে আমার সহধর্ম্মিণীর মুখখানি একবার দেখিয়া যাইতে ইচ্ছা করি।”

 মাতা বলিলেন, “ছি! ছি! বড় ঘৃণার কথা। যুদ্ধযাত্রার যোগ্য অঙ্গসজ্জা রমণীর নয়নতৃপ্তির জন্য নহে। বীর বেশ বীরপুরুষেরই চক্ষুরঞ্জন। বিশেষতঃ, এই সময়ে যাহাতে মনে মায়ার উদ্রেক হয়, বাঁচিবার আশা বৃদ্ধি হয়, এমন কোন স্নেহ-পাত্রের মুখ দেখিতেও নাই, দেখাইতেও নাই। ঈশ্বর-প্রসাদে ফোরাতকূল উদ্ধার করিয়া অগ্রে হোসেন-পরিবারের জীবন রক্ষা কর, মদিনাবাসিগণের প্রাণ বাঁচাও, তাহার পর বিশ্রামসময়ে বিশ্রামের উপকরণ যাহা যাহা, তাহা সকলই পাইবে। বীরপুরুষের মায়া-মমতা কি? বীরধর্ম্মে অনুগ্রহ কি? একদিন জন্মিয়াছ, একদিন মরিবে, শত্রুর সম্মুখীন হইবার অগ্রে স্ত্রী-মুখ দেখিবার অভিলাষ কি জন্য? তুমি যদি মনে মনে স্থির করিয়া থাক যে,—এই শেষ যাত্রা, আর ফিরিব না, জন্মশোধ মুখখানি দেখিয়া যাই, তবে তুমি কাপুরুষ, বীরকুলের কণ্টক, বীরবংশের গ্লানি, বীরকুলের কুলাঙ্গার!

 আবদুল ওহাব আর একটি কথাও না বলিয়া জননীর চরণচুম্বন পূর্ব্বক ঈশ্বরের নাম করিয়া অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে