পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৮০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


V9\9& রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী নেপথ্যে । না না, যেয়ে না, বলে যাও ; আমাকে কী মনে কর বলে । নন্দিনী । কতবার বলেছি, তোমাকে মনে করি আশ্চর্য। প্ৰকাণ্ড হাতে প্ৰচণ্ড জোর ফুলে ফুলে উঠেছে, ঝড়ের আগেকার মেঘের মতো- দেখে আমার মন নাচে । নেপথ্যে । রঞ্জনকে দেখে তোমার মন যে নাচে, সেও কিনন্দিনী । সে কথা থাক, তোমার তো সময় নেই। নেপথ্যে । আছে সময়, শুধু এই কথাটি বলে যাও । নন্দিনী । সে নাচের তাল আলাদা, তুমি বুঝবে না। নেপথ্যে । বুঝব । বুঝতে চাই । নন্দিনী । সব কথা ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারি নে, আমি যাই । নেপথ্যে । যেয়ো না, বলে আমাকে তোমার ভালো লাগে কি না”। নন্দিনী । ইয়া, ভালো লাগে । নেপথ্যে । রঞ্জনের মতোই ? নন্দিনী । ঘুরে ফিরে একই কথা । এ-সব কথা তুমি বোঝা না । নেপথ্যে । কিছু কিছু বুঝি । আমি জানি রঞ্জনের সঙ্গে আমার তফাতটা কী । আমার মধ্যে কেবল জোরই আছে, রঞ্জনের মধ্যে আছে জাদু । নন্দিনী । জাদু বলছি কাকে । নেপথ্যে । বুঝিয়ে বলব ? পৃথিবীর নীচের তলায় পিণ্ড পিণ্ড পাথর লোহা সোনা, সেইখানে রয়েছে জোরের মূর্তি। উপরের তলায় একটুখানি কঁচা মাটিতে ঘাস উঠছে, ফুল ফুটছে- সেইখানে রয়েছে জাদুর খেলা ৷ দুৰ্গমের থেকে হীরে আনি, মানিক আনি ; সহজের থেকে ঐ প্রাণের জাদুটুকু কেড়ে আনতে ୭୩fସି ଭଲ । নন্দিনী ! তোমার এত আছে, তবু কেবলই অমন লোভীর মতো কথা বল কেন । নেপথ্যে । আমার যা আছে সব বোঝা হয়ে আছে । সোনাকে জমিয়ে তুলে তো পরশমণি হয় নাশক্তি যতই বাড়াই যৌবনে পৌঁছল না । তাই পাহারা বসিয়ে তোমাকে বাধতে চাই ; রঞ্জনের মতো যৌবন থাকলে ছাড়া রেখেই তোমাকে বাধতে পারতুম। এমনি করে বাধনের রাশিতে গাট দিতে দিতেই সময় গেল । হায় রে, আর-সব বাধা পড়ে, কেবল আনন্দ বাধা পড়ে না । নন্দিনী । তুমি তো নিজেকেই জালে বেঁধেছি, তার পরে কেন এমন ছটফট করছ বুঝতে পারি। নে । নেপথ্যে । বুঝতে পারবে না। আমি প্ৰকাণ্ড মরুভূমি— তোমার মতো একটি ছোট্ট ঘাসের দিকে হাত বাড়িয়ে বলছি, আমি তপ্ত, আমি রিক্ত, আমি ক্লান্ত । তৃষ্ণার দাহে এই মরুটা কত উর্বরা ভূমিকে লেহন করে নিয়েছে, তাতে মরুর পরিসরই বাড়ছে, ঐ একটুখানি দুর্বল ঘাসের মধ্যে যে প্ৰাণ আছে তাকে আপন করতে পারছে না । নন্দিনী । তুমি-যে এত ক্লান্ত তোমাকে দেখে তো তা মনেই হয় না। আমি তো তোমার মন্ত জোরটাই দেখতে পাচ্ছি । নেপথ্যে । নন্দিন, একদিন দূরদেশে আমারই মতো একটা ক্লান্ত পাহাড় দেখেছিলুম। বাইরে থেকে বুঝতেই পারি নি তার সমস্ত পাথর ভিতরে ভিতরে ব্যথিয়ে উঠেছে। একদিন গভীর রাতে ভীষণ শব্দ শুনলুম, যেন কোন দৈত্যের দুঃস্বপ্ন গুমরে গুমরে হঠাৎ ভেঙে গেল। সকালে দেখি পাহাড়টা ভূমিকম্পের টানে মাটির নীচে তলিয়ে গেছে। শক্তির ভার নিজের অগোচরে কেমন করে নিজেকে পিষে ফেলে, সেই পাহাড়টাকে দেখে তাই বুঝেছিলুম। আর, তোমার মধ্যে একটা জিনিস দেখছি- সে এর উলটাে । নন্দিনী । আমার মধ্যে কী দেখছি । নেপথ্যে । বিশ্বের বঁাশিতে নাচের যে ছন্দ বাজে সেই ছন্দ । নন্দিনী । বুঝতে পারলুম না । নেপথ্যে । সেই ছন্দে বস্তুর বিপুল ভার হালকা হয়ে যায়। সেই ছন্দে গ্ৰহনক্ষত্রের দল ভিখারি