পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৮৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\ONტNტ · রবীন্দ্র-রচনাবলী তবে আসুক-না সেই তিমিররাতি, লুপ্তিনেশার চরম সাথি, তোর ক্লান্ত আঁখি দিক সে ঢাকি দিক-ভোলাবার ঘোরে ! চন্দ্ৰা । যাই বল বিশুবেয়াই, যক্ষপুরীতে এসে তোমরাই মাজেছ । আমাদের মেয়েদের তো কিছু বদল হয় নি । বিশু । হয় নি তো কী । তোমাদের ফুল গেছে শুকিয়ে, এখন ‘সোনা সোনা করে প্রাণটা খাবি খাচ্ছে। চন্দ্ৰা । কখখনো না । বিশু । আমি বলছি, ‘ই’ । ঐ-যে ফাগু হতভাগা বারো ঘণ্টার পরে আরও চার ঘণ্টা যোগ করে খেটে মরে, তার কারণটা ফাগুও জানে না, তুমিও জান না । অন্তর্যামী জানেন । তোমার সোনার স্বপ্ন ভিতরে ভিতরে ওকে চাবুক মারে, সে চাবুক সর্দারের চাবুকের চেয়েও কড়া । চন্দ্ৰা । আচ্ছা বেশ, তা চলো-না কেন, এখান থেকে দেশে ফিরে যাই । বিশু । সর্দার কেবল যে ফেরবার পথ বন্ধ করেছে তা নয়, ইচ্ছেটা সুদ্ধ আটকেছে । আজ যদি-বা দেশে যাও টিকতে পারবে না, কালই সোনার নেশায় ছুটে ফিরে আসবে, আফিমখোর পাখি। যেমন ছাড়া পেলেও ইখাচায় ফেরে । ফাগুলাল । আচ্ছা ভাই বিশু, তুমি তো একদিন পুঁথি পড়ে পড়ে চোখ খোওয়াতে বসেছিলে, তোমাকে আমাদের মতো মুথুদের সঙ্গে কোদাল ধরালে কেন । চন্দ্ৰা । এতদিন আছি, এই কথাটির জবাব বেয়াইয়ের কাছ থেকে কিছুতেই আদায় করা গেল না । ফাগুলাল । অথচ কথাটা সবাই জানে । বিশু । কী বলে দেখি । ফাগুলাল । আমাদের খবর নেবার জন্যে। ওরা তোমাকে চর রেখেছিল । বিশু । সবাই জানতিস যদি তো আমাকে জ্যান্ত রাখলি কেন । ফাগুলাল । এও জানি এ কাজ তোমার দ্বারা হল না । চন্দ্ৰা । এমন আরামের কাজেও টিকতে পারলে না, বেয়াই ? বিশু । আরামের কাজ ? একটা সজীব দেহ, তার পিছনে পৃষ্ঠত্রণ হয়ে লেগে থাকা ! বললুম, “দেশে যাব, শরীর বড়ো খারাপ * সর্দার বললেন, “আহা, এত খারাপ শরীর নিয়ে দেশে যাবেই বা কেমন করে । তবু চেষ্টা দেখো ।” চেষ্টা দেখলুম। শেষে দেখি যক্ষপুরীর কবলের মধ্যে ঢুকলে তার হা বন্ধ হয়ে যায়, এখন তার জঠরের মধ্যে যাবার একটি পথ ছাড়া আর পথই নেই। আজ তার সেই আশাহীন আলোহীন জঠরের মধ্যে তলিয়ে গেছি। এখন তোতে-আমাতে তফাত এই যে, সর্দার তোকে যতটা অবজ্ঞা করে আমাকে তার চেয়েও বেশি । ছেড়া কলাপাতার চেয়ে ভাঙা ভীড়ের প্রতি মানুষের হেলা । ফাগুলাল। দুঃখ কী, বিশুদাদা। আমরা তো তোমাকে মাথায় করে রেখেছি। বিশু । প্রকাশ পেলেই মারা যাব । তোদের আদর পড়ে যেখানে সর্দারের দৃষ্টি পড়ে সেখানেই, সোনাব্যাঙ যতই মকমক শব্দে কোলব্যাঙের অভ্যর্থনা করে, সেটা কানে গিয়ে পৌছয় বোড়াসাপের । চন্দ্ৰা । কতদিনে তোমাদের কাজ ফুরোবে ? বিশু । পাজিতে তো দিনের শেষ লেখে না। একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন ; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত । তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোনো অর্থে পৌছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা । ফাগু ভাই, তুমি কোন সংখ্যা । ফাগুলাল । পিঠের কাপড়ে দাগ আছে, আমি ৪৭ফ । বিশু । আমি ৬৯ঙ। গায়ে ছিলুম মানুষ, এখানে হয়েছি। দশ-পঁচিশের ছক । বুকের উপর দিয়ে জুয়োখেলা চলছে।