পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৮৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রক্তকরবী WDS নন্দিনী । না, দুই হাতে দুই দাড় ধরে সে আমাকে তুফানের নদী পার করে দেয় ; বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে আমাকে বনের ভিতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় ; লাফ-দেওয়া বাঘের দুই ভুরুর মাঝখানে তীর মেরে সে আমার ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে। হা হা করে হাসে । আমাদের নাগাই নদীতে বঁাপিয়ে পড়ে স্রোতটাকে যেমন সে তোলপাড় করে, আমাকে নিয়ে তেমনি সে তোলপাড় করতে থাকে ৷ প্ৰাণ নিয়ে সর্বস্ব পণ করে সে হারজিতের খেলা খেলে । সেই খেলাতেই আমাকে জিতে নিয়েছে। একদিন তুমিও তো তার মধ্যে ছিলে, কিন্তু কী মনে করে বাজিখেলার ভিড় থেকে একলা বেরিয়ে গেলে । যাবার সময় কেমন করে আমার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারলুম না- তার পরে কতকাল খোজ পাই নি । কোথায় তুমি গেলে বলে তো । বিশু । ናffሙፃ ও চাদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে, হল কানায় কানায় কানাকানি এই পারে ওই পারে । আমার তরী ছিল চেনার কুলে, বঁধন তাহার গেল খুলে, তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন অচেনার ধারে । নন্দিনী । সেই অচেনার ধার থেকে এখানে যক্ষপুরীর সুড়ঙ্গ খোদার কাজে কে তোমাকে আবার টেনে VSoforNGGr | বিশু । একজন মেয়ে । হঠাৎ তীর খেয়ে উড়ন্ত পাখি। যেমন মাটিতে পড়ে যায়, সে আমাকে তেমনি করে এই ধুলোর মধ্যে এনে ফেলেছে ; আমি নিজেকে ভুলেছিলুম। নন্দিনী । তোমাকে সে কেমন করে ছুতে পারলে ? বিশু । তৃষ্ণার জল যখন আশার অতীত হয়, মরীচিকা তখন সহজে ভোলায় । তার পরে দিকহারা নিজেকে আব খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন পশ্চিমের জানলা দিয়ে আমি দেখছিলুম মেঘের স্বর্ণপুরী, সে দেখছিল সর্দারের সোনার চুড়া । আমাকে কটাক্ষে বললে, “ঐখানে আমাকে নিয়ে যাও, দেখি কত বড়ো তোমার সামর্থ্য ।” আমি স্পর্ধা করে বললুম, “যাব নিয়ে ” আনলুম তাকে সোনার চুড়ার নীচে । তখন VSSKJ CKK VefS6GF | নন্দিনী । আমি এসেছি। এখান থেকে তোমাকে বের করে নিয়ে যাব । সোনার শিকল ভাঙিব । বিশু । তুমি যখন এখানকার রাজাকে পর্যন্ত টলিয়েছ, তখন তোমাকে ঠেকাবে কিসে। আচ্ছা, তোমার ওকে ভয় করে না ? নন্দিনী । এই জালের বাইরে থেকে ভয় করে । কিন্তু আমি যে ভিতরে গিয়ে দেখেছি । বিশু । কিরকম দেখলে ? নন্দিনী । দেখলুম মানুষ, কিন্তু প্ৰকাণ্ড ৷ কপালখানা যেন সাতমহলা বাড়ির সিংহদ্বার। বাহুদুটাে কোন দুৰ্গম দুর্গের লোহার অর্গল । মনে হল যেন রামায়ণ-মহাভারত থেকে নেমে এসেছে। কেউ । বিশু । ঘরে ঢুকে কী দেখলে ? নন্দিনী । ওর বা হাতের উপর বাজপাখি বসে ছিল ; তাকে দাড়ের উপর বসিয়ে ও আমার মুখে চেয়ে রইল। তার পরে যেমন বাজপাখির পাখার মধ্যে আঙুল চালাচ্ছিল তেমনি করে আমার হাত নিয়ে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একটু পরে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, “আমাকে ভয় করে না ? আমি বললুম, “একটুও না ।” তখন আমার খোলা চুলের মধ্যে দুই হাত ভরে দিয়ে কতক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল । বিশু । তোমার কেমন লাগল ? নন্দিনী । ভালো লাগল । কিরকম বলব ? ও যেন হাজার বছরের বটগাছ, আমি যেন ছোট্ট পাখি । ওর ডালের একটি ডগায় কখনো যদি একটু দোল খেয়ে যাই নিশ্চয় ওর মজার মধ্যে খুশি লাগে। ঐ একলা প্রাণকে সেই খুশিটুকু দিতে ইচ্ছে করে ।