পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রক্তকরবী woዓዒ সর্দার । ওকে সুড়ঙ্গের মধ্যে দলে ভিড়িয়ে দিলে না কেন । মোড়ল । দিয়েছিলুম, ভাবলুম চাপে পড়ে বিশ মানবে । উলটাে হল, খোদাইকরদের উপর থেকেও যেন চাপ নেমে গেল। তাদের মাতিয়ে তুললে ; বললে, ‘আজ আমাদের খোদাই-নৃত্য হবে।” সর্দার । খোদাই-নৃত্য ? তার মানে কী ? মোড়ল । রঞ্জন ধরলে গান । ওরা বললে, “মাদল পাই কোথায় ?” ও বললে, “মাদল না থাকে, কোদাল আছে।” তালে তালে কোদাল পড়তে লাগল ; সোনার পিণ্ড নিয়ে সে কী লোফালুফি ! বড়ো মোড়ল স্বয়ং এসে বললে, “এ কেমন তোমার কাজের ধারা ?? রঞ্জন বললে, “কাজের রশি খুলে দিয়েছি, তাকে টেনে চালাতে হবে না, নেচে চলবে ।” সর্দার । লোকটা পাগল দেখছি । মোড়ল । ঘোর পাগল । বললুম, “কোদাল ধরে ” ও বলে, “তার চেয়ে বেশি কাজ হবে। যদি একটা সারেঙ্গি এনে দাও ।” সর্দার । তোমরা ওকে বজগড়ে নিয়ে গিয়েছিলে, সেখান থেকে কুবেরগড়ে এল। কী করে ? মোড়ল ! কী জানি প্ৰভু ! শিকল দিয়ে তো ওকে কষে বাধা গেল। খানিক বাদে দেখি, কেমন করে পিছলে বেরিয়ে এসেছে— ওর গায়ে কিছু চেপে ধরে না । আর, ও কথায় কথায় সাজ বদল করে চেহারা বদল করে । আশ্চর্য ওর ক্ষমতা । কিছুদিন ও এখানে থাকলে খোদাইকারগুলো পর্যন্ত বাধন মানবে না। সর্দার । ও কী । ঐ না রঞ্জন রাস্তা দিয়ে চলেছে গান গেয়ে ? একটা ভাঙা সারেঙ্গি জোগাড় করেছে। স্পর্ধা দেখো, একটু লুকোবারও চেষ্টা নেই। মোড়ল । তাই তো ! কখন গারদের ভিত কেটে বেরিয়ে এসেছে ! ভেলকি জানে । সর্দার । যাও, এই বেলা ধরোগে ওকে । এ পাড়ায় নন্দিনীর সঙ্গে যেন কিছুতে মিলতে না পারে। মোড়ল। দেখতে দেখতে ওর দল ভারী হয়ে উঠছে। কখন আমাদের সুদ্ধ নাচিয়ে তুলবে। ছোটো সর্দারের প্রবেশ সর্দার । কোথায় চলেছ ? ? ছোটো সর্দার । রঞ্জনকে বাধতে চলেছি । সর্দার । তুমি কেন । মেজো সর্দার কোথায় ? ছোটো সর্দার । ওকে দেখে তার এত মজা লেগেছে, তিনি ওর গায়ে হাত দিতেই চান না । বলেন, “আমরা সর্দাররা কিরকম অদ্ভুত হয়ে উঠেছি, সে ওর হাসি দেখলে বুঝতে পারি।” সর্দার । শোনো, ওকে বাধতে হবে না, রাজার ঘরে পাঠিয়ে দাও । ছোটো সর্দার । ও তো রাজার ডাক মানতেই চায় না । সর্দার । ওকে বলোগে, রাজা ওর নন্দিনীকে সেবাদাসী করে রেখেছে। ছোটো সর্দার । কিন্তু রাজা যদিসর্দার । কিছু ভাবতে হবে না। চলো, আমি নিজে যাচ্ছি। [সকলের প্রস্থান অধ্যাপক ও পুরাণবাগীশের প্রবেশ পুরাণবাগীশ । ভিতরে এ কী প্ৰলয়কাণ্ড হচ্ছে বলো তো । ভয়ংকর শব্দ যে ! অধ্যাপক। রাজা বােধ হয় নিজের উপর নিজে রেগেছে। তাই নিজের তৈরি একটা-কিছু চুরমার করে পুরাণবাগীশ । মনে হচ্ছে, বড়ো বড়ো থাম হুড়মুড় করে পড়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক । আমাদের ঐ পাহাড়তলা জুড়ে একটা সরোবর ছিল, শঙ্খিনীনদীর জল এসে তাতে জমা, হত । একদিন তার বা দিকের পাথরের ভূপটা কাত হয়ে পড়ল, জমা জল পাগলের অট্টহাসির মতো