পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VAbr রবীন্দ্র-রচনাবলী খলখল করে বেরিয়ে চলে গেল। কিছুদিন থেকে রাজাকে দেখে মনে হচ্ছে, ওর সঞ্চয়-সরোবরের পাথরটাতে চাড় লেগেছে, তলাটা ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে এসেছে। পুরাণবাগীশ । বস্তুবাগীশ, এ কোন জায়গায় আমাকে আনলে, আর কী করতেই বা আনলে। অধ্যাপক । জগতে যা-কিছু জানিবার আছে, সমস্তই জানার দ্বারা ও আত্মসাৎ করতে চায়। আমার বস্তুতত্ত্ববিদ্যা প্ৰায় উজাড় করে নিয়েছে ; এখন থেকে থেকে রেগে উঠে বলছে, “তোমার বিদ্যে তো সিধকাঠি দিয়ে একটা দেয়াল ভেঙে তার পিছনে আর-একটা দেয়াল বের করেছে। কিন্তু প্ৰাণপুরুষের অন্দরমহল কোথায় ?” ভাবলুম, এখন কিছুদিন ওকে পুরাণ-আলোচনায় ভুলিয়ে রাখা যাক-আমার থলে ঝাড়া হয়ে গেছে, এখন পুরাবৃত্তের গাঠকটা চলুক। ঐ দেখতে পােচ্ছ, কে যাচ্ছে ? পুরাণবাগীশ । একটি মেয়ে, ধানীরঙের কাপড়-পরা। অধ্যাপক। পৃথিবীর প্রাণভরা খুশিখানা নিজের সর্বাঙ্গে টেনে নিয়েছে, ঐ আমাদের নন্দিনী । এই যক্ষপুরে সর্দার আছে, মোড়ল আছে, খোদাইকর আছে, আমার মতো পণ্ডিত আছে— কোতোয়াল আছে, জল্লাদ আছে, মুর্দািফরাশ আছে, সব বেশ মিশ খেয়ে গেছে। কিন্তু ও একেবারে বেখাপ। চার দিকে হাটের চেঁচামেচি, ও হল সুরবাধা তাম্বুরা। এক-একদিন ওর চলে যাওয়ার হাওয়াতেই আমার বস্তুচৰ্চার জাল ছিড়ে যায় । ফাকের মধ্যে দিয়ে মনোযোগটা বুনোেপাখির মতো হুশ করে উড়ে পালায় । পুরাণবাগীশ । বল কী হে! তোমার পাকা হাড়ে এমন ঠোকাঠুকি বাধে নাকি ? অধ্যাপক । জানার টানের চেয়ে প্ৰাণের টান বেশি হলেই পাঠশালা-পালাবার ঝোক সামলানো যায় না । পুরাণবাগীশ । এখন বলো তো তোমাদের রাজার সঙ্গে দেখা হবে কোথায় ? অধ্যাপক । দেখার উপায় নেই ঐ জালটার আড়াল থেকে আলাপ হবে । পুরাণবাগীশ । বল কী হে ! এই জালের আড়াল থেকে ? অধ্যাপক । তা নয় তো কী । ঘোমটার আড়াল থেকে যেরকম রসালাপ হতে পারে সে ধরনের না, একেবারে ছাকা কথা । ওর গোয়ালের গোরু বোধ হয়। দুধ দিতে জানে না, একেবারেই মাখন দেয় । পুরাণবাগীশ । বাজে কথা বাদ দিয়ে আসল কথা আদায় করাই তো পণ্ডিতের অভিপ্ৰায় । অধ্যাপক । কিন্তু বিধাতার নয় । তিনি আসল জিনিস সৃষ্টি করেছেন বাজে জিনিসকে লালন করবার জন্যে । তিনি সম্মান দেন। ফলের আঁঠিকে, ভালোবাসা দেন। ফলের শাসকে । পুরাণবাগীশ । আজকাল দেখছি তোমার বস্তুতত্ত্ব ধানী রঙের দিকে একটানা ছুটে চলেছে। কিন্তু অধ্যাপক, তোমাদের এই রাজাকে তুমি সহ্য করা কী করে ? অধ্যাপক । সত্যি কথা বলব ? আমি ওকে ভালোবাসি । পুরাণবাগীশ । বল কী হে! অধ্যাপক । তুমি জানো না, ও এত বড়ো যে, ওর দোষগুলোও ওকে নষ্ট করতে পারে না । সর্দারের প্রবেশ সর্দার । ওহে বস্তুবাগীশ, বেছে বেছে এই মানুষটিকে এনেছ বুঝি ! ওঁর বিদ্যের বিবরণ শুনেই আমাদের রাজা ক্ষেপে উঠেছে । অধ্যাপক । কিরকম ? সর্দার । রাজা বলে, পুরাণ বলে কিছুই নেই। বর্তমান কালটাই কেবল বেড়ে বেড়ে চলেছে। পুরাণবাগীশ । পুরাণ যদি নেই তা হলে কিছু আছে কী করে ? পিছন যদি না থাকে তো সামনেটা কি থাকতে পারে ? সর্দার । রাজা বলেন, মহাকাল নবীনকে সম্মুখে প্ৰকাশ করে চলেছে, পণ্ডিত সেই কথাটাকে চাপা দিয়ে বলে : মহাকাল পুরাতনকে পিছনে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক । নন্দিনীর নিবিড় যৌবনের ছায়াবীথিকায় নবীনের মায়ামৃগীকে রাজা চকিতে চকিতে দেখতে । পাচ্ছেন, ধরতে পারছেন না- রেগে উঠছেন আমার বস্তুতত্ত্বর উপর ।