পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৪৩৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চিরকুমার-সভা 8 ֆԳ বিপিন । হয়েছে বৈকি।- তোমার দৌহিত্রীর সঙ্গে ঠাট্টা রাখো, পূর্ণ কাল কুমারসভার সভ্য হয়েছে। শ্ৰীশ । পূর্ণ ! বল কী । তা হলে তো শিলা জলে ভাসল। বিপিন । শিলা। আপনি ভাসে না হে। তাকে আর-কিছুতে অকুলে ভাসিয়েছে। শ্ৰীশ । ওহে বিপিন, পূর্ণ যে খামক চিরকুমার-সভার সভ্য হল তার তো কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । এ সভায় কৈশিককর্ষণ, মাধ্যাকর্ষণ, চুম্বকাকর্ষণ প্রভৃতি কোনো আকর্ষণের বালাই নেই। বিপিন । কে বললে নেই। পর্দার আড়ালে আছে । শ্ৰীশ । আর-একটু খোলসা করে বলে । তোমার বুদ্ধির দীেড়টা কিরকম শুনি । বিপিন । পূর্ণ এ সভার সভ্য হবার পর থেকে আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে তার দুটি চক্ষু সর্বদা ঐ দরজার দিকে পর্দাটার রহস্যভেদ করবার জন্যই নির্দিষ্ট । কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি পর্দার নীচের ফাক দিয়ে দুখানি চরণ দেখা যাচ্ছে। দেখেই বোঝা গেল, সেই চরণের দিকে যার মন বিচরণ করে কুমার-ব্রত রক্ষা করতে গিয়ে সে বিব্রত হবে । শ্ৰীশ । সেই চরণযুগলের চরম তত্ত্বটা ধরতে পারলে ? যাকে একটু করে জানলে মন উতলা হয়। অনেক সময় তাকে সম্পূর্ণ জানলে মন শান্তি পায় । চরণ দুটি কার শুনি । বিপিন । তবে ইতিহাসটা বলি শোনো । জানই তো, পূর্ণ সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্ৰবাবুর কাছে পড়ার নোট নিতে যায় । সেদিন আমি আর পূর্ণ একসঙ্গেই একটু সকাল সকাল চন্দ্রবাবুর বাসায় এসেছিলেম । তিনি একটা মিটিং থেকে সবে এসেছেন । বেহারিা কেরোসিন জ্বেলে দিয়ে গেছে, পূর্ণ বইয়ের পাত ওলটাচ্ছে, এমন সময়- কী আর বলব ভাই, সে যেন বঙ্কিমবাবুর কোন এক অলিখিত নভেলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক কন্যে, পিঠে দুলছে বেণী শ্ৰীশ । বল কী, বল কী বিপিন । বিপিন । শোনোই-না । এক হাতে থালায় করে চন্দ্ৰবাবুর জন্যে জলখাবার, আর-এক হাতে জলের গ্রাস নিয়ে হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে উপস্থিত । আমাদের দেখেই তো কুষ্ঠিত, সচকিত, লজ্জায় মুখ রক্তিমবর্ণ। হাত জোড়া, মাথায় কাপড় দেবার জো নেই। তাড়াতাড়ি টেবিলের উপর খাবার রেখেই ছুটি । পূর্ণর মুখ দেখেই বোঝা গেল, তার মনটা দোদুল্যমান বেণীর পিছন পিছন ছুটেছে। ব্ৰাহ্মা বটে, কিন্তু তেত্ৰিশ কোটির সঙ্গে লজাকে বিসর্জন দেয় নি এবং সত্য বলছি শ্ৰীকেও রক্ষা করেছে ; শ্ৰীশ । বল কী বিপিন, দেখতে ভালো বুঝি । বিপিন । দিব্যি দেখতে । হঠাৎ যেন বিদ্যুতের মতো এসে পড়ে পড়াশুনোয় বজ্ৰাঘাত করে গেল । শ্ৰীশ । আহা, কই আমি তো একদিনও দেখি নি । মেয়েটি কে হে । বিপিন । আমাদের সভাপতির ভাগী, নাম নির্মলা । শ্ৰীশ । ভাগী ? সর্বনাশ ! এইখানেই থাকেন ? বিপিন । সন্দেহমাত্র নেই । সভাপতিমশায় নিজে নিরোগ, কিন্তু রোগের ছোয়াচ নিয়ে ফেরেন । শ্ৰীশ । কিন্তু ভাগ্নেজামাই বলে বালাই নেই বুঝি ? বিপিন । সে বালাইটি অপরিণীত আকারে চিরকুমার-সভায় ঢুকে পড়েছে। পূর্ণ পরিণত আকারে যখন বেরিয়ে পড়বে তখন প্ৰজাপতি কুমার-সভার গুটি বিদীর্ণ করে দেবেন। শ্ৰীশ । তিনি তবে কুমারী ? বিপিন । কুমারী বৈকি। কুমার-সভার মহামারী। এই ঘটনার ঠিক পরেই পূর্ণ হঠাৎ আমাদের কুমার-সভায় নাম লিখিয়েছে । শ্ৰীশ । পুজারি সেজে ঠাকুর চুরি করবার মতলব । আমাকেও তো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে । বিপিন । নারীতিত্ত্বের গবেষণা স্বাস্থ্যকর না হতে পারে । শ্ৰীশ । তোমার স্বাস্থ্যের যদি ব্যাঘাত না হয়ে থাকে তা হলে আমারও— · বিপিন । আরম্ভেতে রোগের প্রবেশ ধরা পড়ে না। কিন্তু, কুমারের মারি যখন ভিতর থেকে ফুটে উঠবে। তখন অশ্বিনীকুমারেরও সাধ্য নেই রক্ষা করে। গোড়ায় সাবধান হওয়া ভালো ।