পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৪৫০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8W9)S রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী শ্ৰীশ । আমরা কখনো কল্পনা করি নি যে, কোনো স্ত্রীলোক আমাদের সভার সভ্য হতে ইচ্ছা প্ৰকাশ করবেন, সুতরাং এ সম্বন্ধে আমাদের কোনো নিয়ম নেই বিপিন । নিষেধও নেই । শ্ৰীশ । স্পষ্ট নিষেধ না থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের সভার যে-সকল উদ্দেশ্য তা স্ত্রীলোকের দ্বারা সাধিত হবার নয় । বিপিন । আমাদের সভার উদ্দেশ্য সংকীর্ণ নয়, এবং বৃহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে গেলে বিচিত্ৰ শ্রেণীর ও বিচিত্ৰ শক্তির লোকের বিচিত্র চেষ্টায় প্রবৃত্ত হওয়া চাই। স্বদেশের হিতসাধন একজন স্ত্রীলোক যেরকম পারবেন তুমি সেরকম পারবে না, এবং তুমি যেরকম পারবে। একজন স্ত্রীলোক সেরকম পারবেন নাঅতএব সভার উদ্দেশ্যকে সর্বাঙ্গসম্পূর্ণভাবে সাধন করতে গেলে তোমারও যেমন দরকার স্ত্রীসভ্যেরও তেমনি দরকার । , শ্ৰীশ । যারা কাজ করতে চায় না। তারাই উদ্দেশ্যকে ফলাও করে তোলে। যথার্থ কাজ করতে গেলেই লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ করতে হয় । আমাদের সভার উদ্দেশ্যকে যত বৃহৎ মনে করে তুমি বেশ নিশ্চিন্ত আছ আমি তত বৃহৎ মনে করি নে। বিপিন । আমাদের সভার কার্যক্ষেত্র অন্তত এতটা বৃহৎ যে তোমাকে গ্ৰহণ করেছে বলে আমাকে পরিত্যাগ করতে হয় নি এবং আমাকে গ্ৰহণ করেছে বলে তোমাকে পরিত্যাগ করতে হয় নি । তোমার আমার উভয়েরই যদি এখানে স্থান হয়ে থাকে, আমাদের দুজনেরই যদি এখানে উপযোগিতা ও আবশ্যকতা থাকে, তা হলে আরো একজন ভিন্ন প্রকৃতির লোকের এখানে স্থান হওয়া এমন কী কঠিন । শ্ৰীশ । উদারতা অতি উত্তম জিনিস, সে আমি নীতিশাস্ত্ৰে পড়েছি । আমি তোমার সেই উদারতাকে নষ্ট করতে চাই নে, বিভক্ত করতে চাই মাত্র । স্ত্রীলোকেরা যে কাজ করতে পারেন তার জন্যে তঁরা স্বতন্ত্র সভা করুন, আমরা তার সভ্য হবার প্রার্থী হব না, এবং আমাদের সভাও আমাদেরই থােক । নইলে আমরা পরস্পরের কাজের বাধা হব। মাত্র । মাথাটা চিন্তা করে মরুক, উদরটা পরিপাক করতে থােক- পাকযন্ত্রটি মাথার মধ্যে এবং মস্তিষ্কটি পেটের মধ্যে প্রবেশচেষ্টা না করলেই বাস। বিপিন । কিন্তু তাই বলে মাথাটা ছিন্ন করে এক জায়গায় এবং পাকযন্ত্রটাকে আর-এক জায়গায় রাখলেও কাজের সুবিধা হয় না । শ্ৰীশ । (অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া) উপমা তো আর যুক্তি নয় যে সেটাকে খণ্ডন করলেই আমার কথাটাকে খণ্ডন করা হল । উপমা কেবল খানিক দূর পর্যন্ত খাটে বিপিন। অর্থাৎ, যতটুকু কেবল তোমার যুক্তির পক্ষে খাটে । পূর্ণ। (অত্যন্ত বিমনা হইয়া) বিপিনবাবু, আমার মত এই যে, আমাদের এই সকল কাজে মেয়ের অগ্রসর হয়ে এলে তাতে তাদের মাধুৰ্য নষ্ট হয় । চন্দ্রবাবু । (একখানা বই চক্ষের অত্যন্ত কাছে ধরিয়া) মহৎ কার্যে যে মাধুর্য নষ্ট হয় সে মাধুর্য সযত্নে রক্ষা করবার যোগ্য নয় । শ্ৰীশ । না চন্দ্ৰবাবু, আমি ও-সব সৌন্দৰ্য-মাধুর্যের কথা আনছিই নে। সৈন্যদের মতো এক চালে আমাদের চলতে হবে, অনভ্যাস বা স্বাভাবিক দুর্বলতা বশত যাদের পিছিয়ে পড়বার সম্ভাবনা আছে তাদের নিয়ে ভারগ্রস্ত হলে আমাদের সমস্তই ব্যর্থ হবে । এমন সময় নির্মলা অকুষ্ঠিত মৰ্যাদার সহিত গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়ানমস্কার করিয়া দাড়াইল হঠাৎ সকলেই স্তম্ভিত হইয়া গেল। অশ্রুপূৰ্ণ ক্ষোভে তাহার কণ্ঠস্বর আর্দ্র নির্মলা । আপনাদের কী উদ্দেশ্য এবং আপনারা দেশের কাজে কত দূর পর্যন্ত যেতে প্ৰস্তুত আছেন তাঁ আমি কিছুই জানি নে, কিন্তু আমি আমার মামাকে জানি- তিনি যে পথে যাত্রা করে চলেছেন। আপনার কেন আমাকে সে পথে তার অনুসরণ করতে বাধা দিচ্ছেন। শ্ৰীশ নিরুত্তর, পূর্ণকুষ্ঠিত-অনুতপ্ত, বিপিন প্রশান্ত-গভীর, চন্দ্ৰবাবু সুগভীর চিন্তামগ্ৰ