পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৪৫২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


BV8 রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী নীরবালা । তোর অন্ত আন্দাজ করবার দরকার কী ভাই। এখন তোর নিজের ভাবনা ভাববার সময় 232 নৃপবালা । (নীরর গলা জড়াইয়া) তুই ভাবছিস, মাগো মা, আমরা কী জঞ্জাল— আমাদের বিদায় করে দিতেও এত ভাবনা এত ঝঞ্জাট । নীরবালা । তা, আমরা তো ভাই, ফেলে দেবার জিনিস নয় যে অমনি ছেড়ে দিলেই হল । আমাদের জন্যে যে এতটা হাঙ্গামা হচ্ছে সে তো গীেরবের কথা । কুমারসম্ভবে তো পড়েছিস গীেরীর বিয়ের জন্য একটি আস্ত দেবতা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যদি কোনো কবির কানে ওঠে তা হলে আমাদের বিবাহের একটা বর্ণনা বেরিয়ে যাবে। নৃপবালা । না ভাই, আমার ভারি লজ্জা করছে। নীরবালা । আর, আমার বুঝি লজ্জা করছে না ? আমি বুঝি বেহায়া ? কিন্তু কী করবি বল। ইস্কুলে যেদিন প্ৰাইজ নিতে গিয়েছিলুম লজ্জা করেছিল, আবার তার পর-বছরেও প্রাইজ নেবার জন্যে রাত জেগে পড়া মুখস্থ করেছিলেম। লজ্জাও করে, প্রাইজও ছাড়ি নে, আমার এই স্বভাব। নৃপবালা । আচ্ছা নীরু, এবারে যে প্রাইজটার কথা চলছে সেটার জন্যে তুই কি খুব ব্যস্ত হয়েছিস । নীরবালা । কোনটা বলা দেখি । চিরকুমার-সভার দুটাে সভ্য ? নৃপবালা । যেই হােক-না কেন, তুই তো বুঝতে পারছিস । নীরবালা । তা ভাই সত্যি কথা বলব ? (নৃপর গলা জড়াইয়া কানে কানে) শুনেছি কুমার-সভার দুটি সভ্যোর মধ্যে খুব ভাব, আমরা যদি দুজনে দুই বন্ধুর হাতে পড়ি তা হলে বিয়ে হয়েও আমাদের ছাড়াছড়ি হবে না- নইলে আমরা কে কোথায় চলে যাব তার ঠিক নেই। তাই তো সেই যুগল দেবতার জন্যে এত পূজার আয়োজন করছি ভাই। জোড়হন্তে মনে মনে বলছি, হে কুমার-সভার অশ্বিনীকুমারযুগল, আমাদের দুটি বোনকে এক বোটার দুই ফুলের মতো তোমরা একসঙ্গে গ্রহণ করো। বিরহস্যম্ভাবনার উল্লেখমাত্রে দুই ভগিনী পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিল এবং নৃপ কোনোমতে চোখের জল সামলাইতে পারিল না। নৃপবালা । আচ্ছা নীরু, মেজদিদিকে কেমন করে ছেড়ে যাবি বলা দেখি। আমরা দুজনে গেলে ওঁর আর কে থাকবে । নীরবালা । সে কথা অনেক ভেবেছি । থাকতে যদি দেন তা হলে কি ছেড়ে যাই । ভাই, ওঁর তো স্বামী নেই, আমাদেরও নাহয় স্বামী না রইল। মেজদিদির চেয়ে বেশি সুখে আমাদের দরকার কী। পুরুষবেশধারিণী শৈলবালার প্রৱেশ নীরবালা । (টেবিলের উপরিস্থিত থালা হইতে একটি ফুলের মালা তুলিয়া লইয়া শৈলবালার গলায় পরাইয়া) আমরা দুই স্বয়ম্বারা তোমাকে আমাদের পতিরূপে বরণ করলুম। শৈলবালাকে প্ৰণাম করিল। শৈলবালা । ও আবার কী । নীরবালা । ভয় নেই ভাই, আমরা দুই সতিনে তোমাকে নিয়ে ঝগড়া করব না। যদি করি সেজদিদি আমার সঙ্গে পারবে না- আমি একলাই মিটিয়ে নিতে পারব, তোমাকে কষ্ট পেতে হবে না । না, সত্যি বলছি মেজদিদি, তোমার কাছে আমরা যেমন আদরে আছি। এমন আদর কি আর কোথাও পাব । কেন আমাদের পরের গলায় দিতে চাস । নৃপর দুই চক্ষু বাহিয়া কার্যকর করিয়া জল পড়িতে লাগিল শৈলবালা । (তাহার চোখ মুছিয়া দিয়া) ও কী ও নৃপ,ছি। তোদের কিসে সুখ তা কি তোরা জানিস । আমাকে নিয়ে যদি তোদের জীবন সাৰ্থক হত তা হলে কি আমি আর-কারও হাতে তোদের দিতে পারতুম |