পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৪৫৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চিরকুমার-সভা । 8VS রসিক ভিন্নরুচিহিঁ লোকঃ । উনি পরিবেশন করতে ভালোবাসেন, আমরা আহার করতে ভালোবাসি, এরকম রুচিভেদে বোধ হয় পরস্পরের কিছু সুবিধা আছে। সকলের আহর শৈলবালা । চন্দ্ৰবাবু, ওটা মিষ্টি, ওটা আগে খাবেন না, এই দিকে তরকারি আছে। জলের গ্রাস খুঁজছেন ? এই-যে গ্লাস । চন্দ্ৰবাবুর পাতে আমি ছিল, তিনি সেটাকে ভালোরাপ আয়ত্ত করিতে পারিতেছিলেন না— অনুতপ্ত শৈল তাড়াতাড়ি তাহা কাটিয়া সহজসাধ্য করিয়া দিল । যে সময়ে যেটি আবশ্যক আন্তে আন্তে হাতের কাছে জোগাইয়া দিয়া তাহার ভোজনব্যাপারটি নির্বিদ্ম করিতে লাগিল চন্দ্ৰবাবু। শ্ৰীশবাবু, স্ত্রীসভ্য নেওয়া সম্বন্ধে আপনি কিছু বিবেচনা করেছেন ? শ্ৰীশ । ভেবে দেখতে গেলে ওতে আপত্তির কারণ বিশেষ নেই, কেবল সমাজের আপত্তির কথাটা আমি ভাবি । বিপিন । সমাজকে অনেক সময় শিশুর মতো গণ্য করা উচিত । শিশুর সমস্ত আপত্তি মেনে চললে শিশুর উন্নতি হয় না, সমাজ সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা খাটে । শ্ৰীশ । আমার বোধ হয় আমাদের দেশে যে এত সভাসমিতির আয়োজন অনুষ্ঠান অকালে ব্যর্থ হয় তার প্রধান কারণ, সে-সকল কার্যে স্ত্রীলোকদের যোগ নেই। রসিকবাবু কী বলেন । রসিক । অবস্থগতিকে যদিও স্ত্রীজাতির সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ নেই। তবু এটুকু জেনেছি- স্ত্রীজাতি হয় যোগ দেন নয় বাধা দেন, হয় সৃষ্টি নয়। প্ৰলয় । অতএব ওঁদের দলে টেনে অন্য সুবিধা যদিবা নাও হয় তবু বাধার হাত এড়ানো যায় । বিবেচনা করে দেখুন, চিরকুমার-সভার মধ্যে যদি স্ত্রীজাতিকে আপনারা গ্ৰহণ করতেন তা হলে গোপনে এই সভাটিকে নষ্ট করবার জন্যে ওঁদের উৎসাহ থাকত না, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় শৈলবালা । কুমার-সভার উপর স্ত্রীজাতির আক্রোশের খবর রসিকদাদা কোথায় পেলে । রসিক । বিপদের খবর না পেলে কি আর সাবধান করতে নেই। একচক্ষু হরিণ যে দিকে কানা ছিল সেই দিক থেকেই তো তীর খেয়েছিল- কুমার-সভা। যদি স্ত্রীজাতির প্রতিই কানা হন তা হলে সেই দিক থেকেই হঠাৎ ঘা খাবেন । শ্ৰীশ । (বিপিনের প্রতি মৃদুস্বরে) একচক্ষু হরিণ তো আজ একটা তীর খেয়েছেন, একটি সভ্য ধূলিশায়ী । চন্দ্ৰবাবু। কেবল পুরুষ নিয়ে যারা সমাজের ভালো করতে চায়। তারা এক পায়ে চলতে চায়। সেইজন্যই খানিক দূর গিয়ে তাদের বসে পড়তে হয় । সমস্ত মহৎ চেষ্টা থেকে মেয়েদের দূরে রেখেছি বলেই আমাদের দেশের কাজে প্রাণসঞ্চার হচ্ছে না । আমাদের হৃদয়, আমাদের কাজ, আমাদের আশা বাইরে ও অন্তঃপুরে খণ্ডিত— সেইজন্যে আমরা বাইরে গিয়ে বক্তৃতা দিই, ঘরে এসে ভুলি। দেখো অবলাকাস্তবাবু, এখনো তোমার বয়স অল্প আছে, এই কথাটি ভালো করে মনে করে রেখো— শ্ৰীজাতিকে অবহেলা কোরো না । স্ত্রীজাতিকে যদি আমরা নিচু করে রাখি তা হলে তারাও আমাদের নীচের দিকেই আকর্ষণ করেন ; তা হলে তাদের ভারে আমাদের উন্নতির পথে চলা অসাধ্য হয়, দু’পা চলেই আবার ঘরের কোণে এসেই আবদ্ধ হয়ে পড়ি । তাদের যদি আমরা উচ্চে রাখি তা হলে ঘরের মধ্যে এসে নিজের আদর্শকে খর্ব করতে লজাবোধ হয় । আমাদের দেশে বাইরে লজ্জা আছে, কিন্তু ঘরের মধ্যে সেই লজটি নেই, সেইজন্যেই আমাদের সমস্ত উন্নতি কেবল বাহ্যিাড়ম্বরে পরিণত হয় । শৈলবালা । আশীৰ্বাদ করুন। আপনার উপদেশ যেন ব্যর্থ না হয়, নিজেকে যেন আপনার আদর্শের উপযুক্ত করতে পারি। বাৰু। আমার ভালী নির্মাকে কুমারসভার সভাশ্রেণীতে ভুক্ত করতে আপনাদের কােনাে আপত্তি