পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫২১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


stretz 8心公 পোস্টমাসটার প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্টমাস্টারকে আসিতে হয় । গ্রামটি অতি সামান্য । নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট আপিস স্থাপন করাইয়াছে । আমাদের পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে । জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল । কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্ৰায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না । অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্ৰতিভ হইয়া থাকে । এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাহার মেলামেশা হইয়া উঠে না । অথচ হাতে কাজ অধিক নাই । কখনো-কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন । তাহাতে এমন ভাব ব্যক্তি করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায়— কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্তা বানাইয়া দেয় এবং সারি সারি অট্টালিকা আকাশের মেঘকে দৃষ্টিপথ হইতে রুদ্ধ করিয়া রাখে, তাহা হইলে এই আধমরা ভদ্রসন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে । পোস্টমাস্টারের বেতন অতি সামান্য । নিজে রাধিয়া খাইতে হয় এবং গ্রামের একটি পিতৃমাতৃহীন অনাথা বালিকা তাহার কাজকর্ম করিয়া দেয়, চারিটি-চারিটি খাইতে পায় । মেয়েটির নাম রতন । বয়স বারো-তেরো । বিবাহের বিশেষ সম্ভাবনা দেখা যায় না । সন্ধ্যার সময় যখন গ্রামের গোয়ালঘর হইতে ধুম কুণ্ডলায়িত হইয়া উঠিত, ঝোপে ঝোপে ঝিল্লি ডাকিত, দূরে গ্রামের নেশাখের বাউলের দল খোল-করতাল বাজাইয়া উচ্চৈঃস্বরে গান জুড়িয়া দিত- যখন অন্ধকার দাওয়ায় একলা বসিয়া গাছের কম্পন দেখিলে কবিহীদয়েও ঈষৎ হৃৎকম্প উপস্থিত হইত। তখন ঘরের কোণে একটি ক্ষীণশিখা প্ৰদীপ জ্বালিয়া পোস্টমাস্টার ডাকিতেন ‘রতন । রতন দ্বারে বসিয়া এই ডাকের জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিত কিন্তু এক ডাকেই ঘরে আসিত না— বলিত, “কী গা বাবু, কেন ডাকছি।” পোস্টমাস্টার । তুই কী করছিস । রতন । এখনই চুলে ধরাতে যেতে হবে- হেঁশেলেরপোস্টমাস্টার । তোর হেঁশেলের কাজ পরে হবে এখন- একবার তামাকটা সেজে দে তো । অনতিবিলম্বে দুটি গাল ফুলাইয়া কলিকায় ফু দিতে দিতে রতনের প্রবেশ । হাত হইতে কলিকাটা লইয়া পোস্টমাস্টার ফস করিয়া জিজ্ঞাসা করেন, “আচ্ছা রতন, তোর মাকে মনে পড়ে ?” সে অনেক কথা ; কতক মনে পড়ে, কতক মনে পড়ে না । মায়ের চেয়ে বাপ তাহাকে বেশি ভালোবাসিত, বাপকে অল্প অল্প মনে আছে । পরিশ্রম করিয়া বাপ সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরিয়া আসিত, তাহারই মধ্যে দৈবাৎ দুটি-একটি সন্ধ্যা তাহার মনে পরিষ্কার ছবির মতো অঙ্কিত আছে। এই কথা হইতে হইতে ক্রমে রতন পোস্টমাস্টারের পায়ের কাছে মাটির উপর বসিয়া পড়িত। মনে পড়িত, তাহার একটি ছোটােভাই ছিল— বহু পূর্বেকার বর্ষার দিনে একদিন একটা ডোবার ধারে দুইজনে মিলিয়া গাছের ভাঙা ডালকে ছিপা করিয়া মিছামিছি। মাছধরা খেলা করিয়াছিল- অনেক গুরুতর ঘটনার চেয়ে সেই কথাটাই তাহার মনে বেশি উদয় হইত। এইরূপ কথাপ্রসঙ্গে মাঝে মাঝে বেশি রাত হইয়া যাইত, তখন আলস্যক্রমে পোস্টমাস্টারের আর রাধিতে ইচ্ছা! করিত না । সকালের বাসী ব্যঞ্জন থাকিত এবং রতন তাড়াতাড়ি উনুন ধরাইয়া খানকয়েক রুটি সেঁকিয়া আনিত- তাহতেই উভয়ের রাত্রের আহার চলিয়া যাইত । এক-একদিন সন্ধ্যাবেলায় সেই বৃহৎ আটচালার কোণে আপিসের কাঠের চৌকির উপর বসিয়া পোস্টমাস্টারও নিজের ঘরের কথা পাড়িতেন- ছোটোভাই, মা এবং দিদির কথা, প্রবাসে একলা ঘরে