পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫২৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ (OS অধীরচিত্তে তাহার দরখাস্তের উত্তর প্রতীক্ষা করিতেছেন । বালিকা দ্বারের বাহিরে বসিয়া সহস্ৰাবার করিয়া তাহার পুরানো পড়া পড়িল । পাছে যেদিন সহসা ডাক পড়িবে সেদিন তাহার যুক্ত-অক্ষর সমস্ত গোলমাল হইয়া যায়, এই তাহার একটা আশঙ্কা ছিল । অবশেষে সপ্তাহখানেক পরে একদিন সন্ধ্যাবেলায় ডাক পড়িল । উদবেলিতহাদয়ে রতন গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বলিল, “দাদাবাবু, আমাকে ডাকছিলে ?” পোস্টমাস্টার বলিলেন, “রতন, কালই আমি যাচ্ছি।” রতন । কোথায় যােচ্ছ, দাদাবাবু। পোস্টমাস্টার । বাড়ি যাচ্ছি। রতন । আবার কাবে আসবে । পোস্টমাস্টার । আর আসব না । রতন আর-কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিল না । পোস্টমাস্টার আপনিই তাহাকে বলিলেন, তিনি বদলির জন্য দরখাস্ত করিয়াছিলেন, দরখাস্ত নামঞ্জর হইয়াছে ; তাই তিনি কাজে জবাব দিয়া বাড়ি যাইতেছেন । অনেকক্ষণ আর কেহ কোনো কথা কহিল না । মিটমিটু করিয়া প্ৰদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং একস্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ টপ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল । কিছুক্ষণ পরে রতন আস্তে আস্তে উঠিয়া রান্নাঘরে রুটি গড়িতে গেল । অন্যদিনের মতো তেমন চটপট হইল না । বোধ করি মধ্যে মধ্যে মাথায় অনেক ভাবনা উদয় হইয়াছিল । পোস্টমাস্টারের আহার সমাপ্ত হইলে পর বালিকা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “দাদাবাবু, আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে ?” পোস্টমাস্টার হাসিয়া কহিলেন, “সে কী করে হবে।” ব্যাপারটা যে কী কী কারণে অসম্ভব তাহা বালিকাকে বুঝানো আবশ্যক বোধ করিলেন না । সমস্ত রাত্রি স্বপ্নে এবং জাগরণে বালিকার কানে পোস্টমাস্টারের হাস্যধ্বনির কণ্ঠস্বর বাজিতে লাগিল“সে কী করে হবে । ভোরে উঠিয়া পোস্টমাস্টার দেখিলেন, তাহার স্নানের জল ঠিক আছে ; কলিকাতার অভ্যাস অনুসারে তিনি তোলা জলে স্নান করিতেন । কখন তিনি যাত্ৰা করিবেন। সে কথা বালিকা কী কারণে জিজ্ঞাসা করিতে পারে নাই ; পাছে প্ৰাতঃকালে আবশ্যক হয় এইজন্য রতন তত রাত্রে নদী হইতে র্তাহার স্নানের জল তুলিয়া আনিয়াছিল। স্নান সমাপন হইলে রতনের ডাক পড়িল। রতন নিঃশব্দে গৃহে প্ৰবেশ করিল এবং আদেশ প্ৰতীক্ষায় একবার নীরবে প্রভুর মুখের দিকে চাহিল । প্ৰভু কহিলেন, “রতন, আমার জায়গায় যে লোকটি আসবেন তাকে বলে দিয়ে যাব। তিনি তোকে আমারই মতন যত্ন করবেন, আমি যাচ্ছি বলে তোকে কিছু ভাবতে হবে না৷ ” এই কথাগুলি যে অত্যন্ত মেহগর্ভ এবং দয়ার্ক্স হৃদয় হইতে উখিত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই, কিন্তু নারীহাদয় কে বুঝিবে । রতন অনেকদিন প্রভুর অনেক তিরস্কার নীরবে সহ্য করিয়াছে কিন্তু এই নরম কথা সহিতে পারিল না । একেবারে উচ্ছসিতহাদয়ে কাদিয়া উঠিয়া কহিল, “না না, তোমার কাউকে কিছু বলতে হবে না, আমি থাকতে চাই নে ৷” পোস্টমাস্টার রতনের এরূপ ব্যবহার কখনো দেখেন নাই, তাই অবাক হইয়া রহিলেন । নূতন পোস্টমাস্টার আসিল । তাঁহাকে সমস্ত চার্জ বুঝাইয়া দিয়া পুরাতন পোস্টমাস্টার গমনোন্মুখ হইলেন । যাইবার সময় রতনকে ডাকিয়া বলিলেন, “রতন, তোকে আমি কখনো কিছু দিতে পারি নি। আজ যাবার সময় তোকে কিছু দিয়ে গেলুম, এতে তোর দিনকয়েক চলবে ।” কিছু পথখরচা বাদে তাহার বেতনের যত টাকা পাইয়াছিলেন পকেট হইতে বাহির করিলেন । তখন রতন ধুলায় পড়িয়া তঁহার পা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “দাদাবাবু, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে কিছু দিতে হবে না ; তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমার জন্যে কাউকে কিছু ভাবতে হবে না”— বলিয়া এক দৌড়ে সেখান হইতে পলাইয়া গেল । ভূতপূর্ব পোস্টমাস্টার নিশ্বাস ফেলিয়া হাতে কার্পেটের ব্যাগ ঝুলাইয়া, কাধে ছাতা লইয়া, মুটের মাথায় নীল ও শ্বেত রেখায় চিত্রিত টিনের পেটরা তুলিয়া ধীরে ধীরে নীেকাভিমুখে চলিলেন । যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাড়িয়া দিল, বর্ষবিন্যফারিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রণী:রাশির মতো