পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫২৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


fo) রবীন্দ্র-রচনাবলী চারি দিকে ছলছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেনএকটি সামান্য গ্ৰাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্ৰকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, “ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি - কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরতার বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে- এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী । পৃথিবীতে কে কাহার। কিন্তু রতনের মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হইল না । সে সেই পোস্ট আপিস গৃহের চারি দিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বোধ করি তাহার মনে ক্ষীণ আশা জাগিতেছিল, দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে- সেই বন্ধনে পড়িয়া কিছুতেই দুরে যাইতে পারিতেছিল না। হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয় ! ভ্ৰান্তি কিছুতেই ঘোচে না, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান বহুবিলম্বে মাথায় প্রবেশ করে, প্রবল প্রমাণকেও অবিশ্বাস করিয়া মিথ্যা। আশাকে দুই বাহুপাশে বাধিয়া বুকের ভিতরে প্রাণপণে জড়াইয়া ধরা যায়, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ী কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্ৰান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে । S Sar 2 গিন্নি ছাত্রবৃত্তি ক্লাসের দুই-তিন শ্রেণী নীচে আমাদের পণ্ডিত ছিলেন শিবনাথ। তাহার গোফদাড়ি কামানো, চুল ছােটা এবং টিকিট হ্রস্ব । তঁহাকে দেখিলেই বালকদের অন্তরাত্মা শুকাইয়া যাইত । প্ৰাণীদের মধ্যে দেখা যায়, যাহাদের হুল আছে। তাঁহাদের দাঁত নাই। আমাদের পণ্ডিতমহাশয়ের দুই একত্রে ছিল । এ দিকে কিল চড় চাপড় চারাগাছের বাগানের উপর শিলাবৃষ্টির মতো অজস্র বর্ষিত হইত, ও দিকে তীব্র বাক্যজালায় প্ৰাণ বাহির হইয়া যাইত । ইনি আক্ষেপ করিতেন, পুরাকালের মতো গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ এখন আর নাই ; ছাত্রেরা গুরুকে আর দেবতার মতো ভক্তি করে না ; এই বলিয়া আপনার উপেক্ষিত দেবমহিমা বালকদের মস্তকে সবেগে নিক্ষেপ করিতেন ; এবং মাঝে মাঝে হুংকার দিয়া উঠিতেন, কিন্তু তাহার মধ্যে এত ইতর কথা মিশ্রিত থাকিত যে তাহাকে দেবতার বাজনাদের রূপান্তর বলিয়া কাহারও ভ্ৰম হইতে পারে না । বাপান্ত যদি বাজনাদ সাজিয়া তর্জনগর্জন করে, তাহার ক্ষুদ্র বাঙালিমূর্তি কি ধরা পড়ে না। যাহা হউক, আমাদের স্কুলের এই তৃতীয়শ্রেণী দ্বিতীয়বিভাগের দেবতাটিকে ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ অথবা কার্তিক বলিয়া কাহারও ভ্ৰম হইত না ; কেবল একটি দেবতার সহিত র্তাহার সাদৃশ্য উপলব্ধি করা যাইত, তাহার নাম যম ; এবং এতদিন পরে স্বীকার করিতে দোষ নাই এবং ভয়ও নাই, আমরা মনে মনে কামনা করিতাম, উক্ত দেবালয়ে গমন করিতে তিনি যেন আর অধিক বিলম্ব না করেন । কিন্তু এটা বেশ বুঝা গিয়াছিল, নরদেবতার মতো বালাই আর নাই। সুরলোকবাসী দেবতাদের উপদ্ৰব নাই। গাছ হইতে একটা ফুল পাড়িয়া দিলে খুশি হন, না দিলে তাগাদা করিতে আসেন না । আমাদের নারদেবগণ চান অনেক বেশি, এবং আমাদের তিলমাত্র ক্রটি হইলে চক্ষুদুটাে রক্তবর্ণ করিয়া তাড়া করিয়া আসেন, তখন তাহাদিগকে কিছুতেই দেবতার মতো দেখিতে হয় না। বালকদের পীড়ন করিবার জন্য আমাদের শিবনাথপণ্ডিতের একটি অস্ত্র ছিল, সেটি শুনিতে যৎসামান্য কিন্তু প্ৰকৃতপক্ষে অত্যন্ত নিদারুণ । তিনি ছেলেদের নূতন নামকরণ করিতেন । নাম জিনিসটা যদিচ শব্দ বৈ আর কিছুই নয়। কিন্তু সাধারণত লোকে আপনার চেয়ে আপনার নামটা বেশি ভালোবাসে ; নিজের নাম রাষ্ট্র লোকে কী কষ্টই না। স্বীকার করে, এমন-কি, নামটিকে বঁাচাইবার জন্য লোকে আপনি মরিতে श कीं ।