পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫২৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


○ ○8 রবীন্দ্র-রচনাবলী সেদিন তাঁহাদের পুতুলের বিয়ে । তাঁহারই আয়োজন সম্বন্ধে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যস্ত হইয়া আশু তাহার ভগিনীকে উপদেশ দিতেছিল । এখন তর্ক উঠিল, কাহাকে পুরোহিত করা যায়। বালিকা চট করিয়া ছুটিয়া একজনকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ই গা, তুমি আমাদের পুরুতষ্ঠাকুর হবে ?” আশু পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখে, শিবনাথপণ্ডিত ভিজা ছাতা মুড়িয়া অৰ্ধসিক্ত অবস্থায় তাহাদের গাড়িবারান্দায় দাড়াইয়া আছেন ; পথ দিয়া যাইতেছিলেন, বৃষ্টির উপদ্রব হইতে সেখানে আশ্রয় লইয়াছেন। বালিকা তঁহাকে পুতুলের পৌরোহিত্যে নিয়োগ করিবার প্রস্তাব করিতেছে। পণ্ডিতমশায়কে দেখিয়াই আশু তাহার খেলা এবং ভগিনী সমস্ত ফেলিয়া এক দৌড়ে গৃহের মধ্যে অন্তহিঁত হইল। তাহার ছুটির দিন সম্পূর্ণ মাটি হইয়া গেল । পরদিন শিবনাথপণ্ডিত যখন শুষ্ক উপহাসের সহিত এই ঘটনাটি ভূমিকাস্বরূপে উল্লেখ করিয়া সাধারণসমক্ষে আশুরা “গিন্নি’ নামকরণ করিলেন, তখন প্রথমে সে যেমন সকল কথাতেই মৃদুভাবে হাসিয়া থাকে তেমন করিয়া হাসিয়া চারি দিকের কৌতুকহাস্যে ঈষৎ যোগ দিতে চেষ্টা করিল ; এমন সময় একটা ঘণ্টা বাজিল, অন্য সকল ক্লাস ভাঙিয়া গেল, এবং শালপাতায় দুটি মিষ্টান্ন ও ঝকঝকে র্কাসার ঘটিতে জল লইয়া দাসী আসিয়া দ্বারের কাছে দাড়াইল । তখন হাসিতে হাসিতে তাহার মুখ কান টকটকে লাল হইয়া উঠিল, ব্যথিত কপালের শিরা ফুলিয়া উঠিল, এবং উচ্ছসিত অশ্রুজল আর কিছুতেই বাধা মানিল না। শিবনাথপণ্ডিত বিশ্রামগৃহে জলযোগ করিয়া নিশ্চিন্তমনে তামাক খাইতে লাগিলেন- ছেলেরা পরমহলাদে আশুকে ঘিরিয়া “গিন্নি গিন্নি’ করিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। সেই ছুটির দিনের ছোটােবোনের সহিত খেলা জীবনের একটি সর্বপ্রধান লজ্জাজনক ভ্ৰম বলিয়া আশুর কাছে বোধ হইতে লাগিল, পৃথিবীর লোক কোনোকালেও যে সেদিনের কথা ভুলিয়া যাইবে এ তাহার মনে বিশ্বাস হইল না । S Sabr 2 যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাটু চিবুক পর্যন্ত উখিত করিয়া কাচা তেঁতুল, কঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল, তখন তুপাকৃতি চর্কিত ডাটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গভীরমুখে কহিলেন, “দুটাে পান্তাভাত যে মুখে দেব, তারও जोश 2ोंGशों यीश कीं ।” এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পাৰ্থে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, “দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলে !” গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, “আমি বলি, তুমি লিখিয়া লও।” রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্ৰস্তুত হইলেন । গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, “আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্ৰীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।” রামকানাই লিখিলেন- কিন্তু লিখিতে র্তাহার কলম সরিতেছিল না। তঁহার বড়ো আশা ছিল, তাহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্ৰক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগন্ন ছিলেন তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই— এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিৰ্ম্মফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য