পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৩২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


SO রবীন্দ্র-রচনাবলী ঘটিত, তাহা দৈবক্ৰমেও একদিন ঘটিল না । রবিবার দিনে ভাবিল, পূর্বনিয়মমত আজও হিমাংশু সকালে আমাদের এখানে খাইতে আসিবে। ঠিক যে বিশ্বাস করিল। তাহা নয়। কিন্তু তবু আশা ছাড়িতে পারিল না । সকাল আসিল, সে আসিল না । তখন বনমালী বলিল, তবে আহার করিয়া আসিবে ।’ আহার করিয়া আসিল না । বনমালী ভাবিল, “আজ বোধ হয় আহার করিয়া ঘুমাইতেছে । ঘুম ভাঙিলেই আসিবে ।’ ঘুম কখন ভাঙিল জানি না, কিন্তু उनिन नां । আবার সেই সন্ধ্যা হইল, রাত্রি আসিল, হিমাংশুদের দ্বার একে একে রুদ্ধ হইল, আলোগুলি একে একে নিবিয়া গেল । এমনি করিয়া সোমবার হইতে রবিবার পর্যন্ত সপ্তাহের সাতটা দিনই যখন দূরদৃষ্ট তাহার হাত হইতে কড়িয়া লইল,--আশাকে আশ্রয় দিবার জন্য যখন আর একটা দিনও বাকি রহিল না, তখন হিমাংশুদের রুদ্ধদ্বার অট্টালিকার দিকে তাহার অশ্রুপূর্ণ দুটি কাতর চক্ষু বড়ো-একটা মৰ্মভেদী অভিমানের নালিশ পঠাইয়া দিল এবং জীবনের সমস্ত বেদনাকে একটিমাত্র আর্তম্বরের মধ্যে সংহত করিয়া বলিল, “দয়াময় ?” SSIbr ? লেখকজাতির প্রকৃতি অনুসারে তারাপ্রসন্ন কিছু লাজুক এবং মুখচোরা ছিলেন । লোকের কাছে বাহির হইতে গেলে তাহার সর্বনাশ উপস্থিত হইত। ঘরে বসিয়া কলম চালাইয়া তাহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, পিঠ একটু কুঁজা, সংসারের অভিজ্ঞতা অতি অল্প। লৌকিকতার বঁধি বোলসকল সহজে তাহার মুখে আসিত না, এইজন্য গৃহদুর্গের বাহিরে তিনি আপনাকে কিছুতেই নিরাপদ মনে করিতেন না। লোকেও তাঁহাকে একটা উজবুক রকমের মনে করিত এবং লোকেরও দোষ দেওয়া যায় না । মনে করো, প্ৰথম পরিচয়ে একটি পরম ভদ্রলোক উচ্ছসিত কণ্ঠে তারাপ্ৰসন্নকে বলিলেন, “মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হয়ে যে কী পর্যন্ত আনন্দ লাভ করা গেল, তা একমুখে বলতে পারি নে”- তারা প্ৰসন্ন নিরুত্তর হইয়া নিজের দক্ষিণ করতল বিশেষ মনোযোগপূর্বক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ সে নীরবতার অর্থ এইরূপ মনে হয়, “তা, তোমার আনন্দ হয়েছে সেটা খুব সম্ভব বটে, কিন্তু আমার যে আনন্দ হয়েছে, এমন মিথ্যা কথাটা কী করে মুখে উচ্চারণ করব তাই ভাবছি।” মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্ৰণ করিয়া লক্ষপতি গৃহস্বামী যখন সায়াহ্নের প্রাকালে পরিবেশন করিতে আরম্ভ করেন এবং মধ্যে মধ্যে বিনীত কাকুতিসহকারে ভোজ্যসামগ্ৰীীর অকিঞ্চিৎকারত্ব সম্বন্ধে তারা প্ৰসন্নকে সম্বোধনপূর্বক বলিতে থাকেন, “এ কিছুই না। অতি যৎসামান্য। দরিদ্রের খুদকুঁড়া, বিদুরের আয়োজন। । মহাশয়কে কেবলই কষ্ট দেওয়া”- তারাপ্ৰসন্ন চুপ করিয়া থাকেন, যেন কথাটা এমনি প্রমাণিক যে তাহার | আর উত্তর সম্ভাবে না । মধ্যে মধ্যে এমনও হয়, কোনো সুশীল ব্যক্তি যখন তারাপ্ৰসন্নকে সংবাদ দেন যে, তাহার মতো অগাধ পাণ্ডিত্য বর্তমানকালে দুর্লভ এবং সরস্বতী নিজের পদ্মাসন পরিত্যাগপূর্বক তারাপ্রসক্সের কণ্ঠাগ্রে বাসস্থান গ্ৰহণ করিয়াছেন, তখন তারাপ্ৰসন্ন তাহার তিলমাত্র প্রতিবাদ করেন না, যেন সত্য সত্যই সরস্বতী তাহার কণ্ঠরোধ করিয়া বসিয়া আছেন । তারাপ্রসক্সের এইট জানা উচিত যে, মুখের সামনে যাহারা প্ৰশংসা করে এবং পরের কাছে যাহারা আত্মনিন্দায় প্রবৃত্ত হয়, তাহারা অন্যের নিকট হইতে প্রতিবাদ প্রত্যাশা করিয়াই অনেকটা অসংকোচে অত্যুক্তি করিয়া থাকে-অপর পক্ষ আগাগোড়া সমস্ত কথাটা যদি অম্লানবদনে গ্ৰহণ করে, তবে বক্তা আপনাকে প্রতারিত জ্ঞান করিয়া বিষম ক্ষুব্ধ হয় । এইরূপ স্থলে লোকে নিজের কথা মিথ্যা প্ৰতিপন্ন হইলে দুঃখিত হয় না।