পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৩৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(* R রবীন্দ্র-রচনাবলী বিক্রয়ের জন্য বহির দোকানে এবং সমালোচনার জন্য দেশের ছোটো বড়ো সমস্ত সম্পাদকের নিকট ‘বেদান্তপ্রভাকর পাঠাইয়া দিলেন। ডাকযোগে গৃহিণীকেও একখানা বই রেজেস্টারি করিয়া পাঠাইলেন । আশঙ্কা ছিল, পাছে ডাকওয়ালারা পথের মধ্য হইতে চুরি করিয়া লয় । গৃহিণী যেদিন ছাপার বইয়ের উপরের পৃষ্ঠায় ছাপার অক্ষরে তাহার স্বামীর নাম দেখিলেন, সেদিন পাড়ার সকল মেয়েকে নিমন্ত্ৰণ করিয়া খাওয়াইলেন । যেখানে সকলে আসিয়া বসিবার কথা, সেইখানে বইটা ফেলিয়া রাখিলেন । সকলে আসিয়া বসিলে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “ওমা, বইটা ওখানে কে ফেলে রেখেছে । অন্নদা, বইটা দাও-না ভাই, তুলে রাখি।” উহাদের মধ্যে অন্নদা পড়িতে জানে। বইটা কুলঙ্গির উপর তুলিয়া রাখিলেন । মুহুর্তপরে একটা জিনিস পাড়িতে গিয়া ফেলিয়া দিলেন— তার পরে নিজের বড়ো মেয়েকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “শশী, বাবার বই পড়তে ইচ্ছে হয়েছে বুঝি ? তা নে-ন মা, পড়ােনা । তাতে লজ্জা কী ।” বাবার বহির প্রতি শশীর কিছুমাত্র আগ্রহ ছিল না । কিছুক্ষণ পরেই তাহাকে ভৎসনা করিয়া বলিলেন, “ছি মা, বাবার বই আমন করে নষ্ট করতে নেই, তোমার কমলাদিদির হাতে দাও, উনি ঐ আলমারির মাথায় তুলে রাখবেন ।” বহির যদি কিছুমাত্র চেতনা থাকিত, তাহা হইলে সেই একদিনের উৎপীড়নে বেদান্তের প্রাণান্তপরিচ্ছেদ হইত । একে একে কাগজে সমালোচনা বাহির হইতে লাগিল । গৃহিণী যাহা ঠাহরাইয়াছিলেন, তাহা অনেকটা সত্য হইয়া দাড়াইল । গ্রন্থের এক অক্ষর বুঝিতে না পারিয়া দেশসুদ্ধ সমালোচক একেবারে বিহবল হইয়া উঠিল । সকলেই একবাক্যে কহিল, “এমন সারবান গ্ৰন্থ ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয় নাই ।” যে-সকল সমালোচক রেনলডুসের লন্ডনরহস্যের বাংলা অনুবাদ ছাড়া আর-কোনো বই স্পর্শ করিতে পারে না, তাহারা অত্যন্ত উৎসাহের সহিত লিখিল, “দেশের ঝুড়ি ঝুড়ি নাটক-নবেলের পরিবর্তে যদি এমন দুই-একখানি গ্ৰন্থ মধ্যে মধ্যে বাহির হয়, তবে বঙ্গসাহিত্য বাস্তবিকই পাঠ্য হয়।” যে ব্যক্তি পুরুষানুক্রমে বেদান্তের নাম কখনো শুনে নাই সেই কেবল লিখিল, “তারাপ্ৰসন্নবাবুর সহিত সকল স্থানে আমাদের মতের মিল হয় নাই- স্থানাভাববশত এস্থলে তাহার উল্লেখ করিলাম না । কিন্তু মোটের উপরে গ্রন্থকারের সহিত আমাদের মতের অনেক ঐক্যই লক্ষিত হয়।” কথাটা যদি সত্য হইত, তাহা হইলে মোটের উপর গ্ৰন্থখানি পুড়াইয়া ফেলা উচিত ছিল । দেশের যেখানে যত লাইব্রেরি ছিল এবং ছিল না, তাহার সম্পাদকগণ মুদ্রার পরিবর্তে মুদ্রাঙ্কিত পত্রে তারা প্ৰসন্ত্রের গ্রন্থ ভিক্ষা চাহিয়া পাঠাইলেন । অনেকেই লিখিল, “আপনার এই চিন্তাশীল গ্রন্থে দেশের একটি মহৎ অভাব দূর হইয়াছে।” চিন্তাশীল গ্ৰন্থ কাহাকে বলে, তারাপ্ৰসন্ন ঠিক বুঝিতে পারিলেন না। কিন্তু পুলকিতচিত্তে ঘর হইতে মাসুল দিয়া প্রত্যেক লাইব্রেরিতে ‘বেদান্তপ্রভাকর পাঠাইয়া দিলেন। এইরূপ অজস্র স্তুতিবাক্যে তারাপ্ৰসন্ন যখন অতিমাত্র উৎফুল্প হইয়া উঠিয়াছেন, এমন সময়ে পত্ৰ পাইলেন দাক্ষায়ণীর পঞ্চম সন্তানসম্ভাবনা অতি নিকটবতী হইয়াছে । তখন রক্ষকটিকে সঙ্গে করিয়া অর্থসংগ্রহের জন্য দোকানে গিয়া উপস্থিত হইলেন । সকল দোকানদার একবাক্যে বলিল, একখানি বইও বিক্রয় হয় নাই। কেবল এক জায়গায় শুনিলেন, মফস্বল হইতে কে—একজন তাহার এই বই চাহিয়া পঠাইয়াছিল এবং তাঁহাকে ভ্যালুপেবেলে পাঠানোও হইয়াছিল, কিন্তু বই ফেরত আসিয়াছে, কেহ গ্ৰহণ করে নাই। দোকানদারকে তাহার মাসুল দণ্ড দিতে হইয়াছে, সেইজন্য সে বিষম আক্ৰোশে গ্ৰন্থকারের সমস্ত বহি তখনই তঁহাকে প্রত্যাৰ্পণ করিতে উদ্যত হইল । গ্ৰন্থকার বাসায় ফিরিয়া আসিয়া অনেক ভাবিলেন। কিন্তু কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন না। র্তাহার চিন্তাশীল গ্রন্থ সম্বন্ধে যতই চিন্তা করিলেন, ততই অধিকতর উদবিগ্ন হইয়া উঠিতে লাগিলেন। অবশেষে যে-কয়েকটি টাকা অবশিষ্ট ছিল, তাহাই অবলম্বন করিয়া অবিলম্বে গৃহাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তারাপ্ৰসন্ন গৃহিণীর নিকট আসিয়া অত্যন্ত আড়ম্বরের সহিত প্ৰফুল্লতা প্ৰকাশ করিলেন । দীক্ষায়ণী শুভ সংবাদের জন্য সহাস্যমুখে প্ৰতীক্ষা করিয়া রহিলেন ।