পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৩৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(ζΣ 8 রবীন্দ্র-রচনাবলী করাইয়া লইলেন। আর বলিলেন, বিধুভুষণের উপর কিছুই বিশ্বাস নাই, সেই তাহার স্বামীর সর্বনাশ করিয়াছে। নতুবা ঔষধ মাদুলি এবং মাথার দিব্য-সমেত র্তাহার সমস্ত স্বামীটিকে তাহার হস্তে দিয়া যাইতেন । তার পরে মহাদেবের মতো তাহার বিশ্বাসপ্রবণ ভোলানাথ স্বামীটিকে পৃথিবীর নির্মম কুটিলবুদ্ধি চক্রান্তকারীদের সম্বন্ধে বার বার সতর্ক করিয়া দিলেন । অবশেষে চুপিচুপি বলিলেন, “দেখো, আমার যে মেয়েটি হইবে, সে যদি বঁাচে তাহার নাম রাখিয়ো “বেদান্তপ্ৰভা', তার পরে তাহাকে শুধু প্ৰভা বলিয়া ডাকিলেই চলিবে ।” এই বলিয়া স্বামীর পায়ের ধুলা মাথায় লইলেন । মনে মনে কহিলেন, “কেবল কন্যা জন্ম দিবার জন্যই স্বামীর ঘরে আসিয়াছিলাম । এবার বোধ হয় সে আপদ ঘুচিল ।” ধাত্রী যখন বলিল, “মা, একবার দেখো, মেয়েটি কী সুন্দর হয়েছে”— মা একবার চাহিয়া নেত্ৰ নিমীলন করিলেন, মৃদুস্বরে বলিলেন ‘বেদান্তপ্রভা” । তার পরে ইহসংসারে আর-একটি কথা বলিবারও অবসর 9°ळ्नन् व् ! S SRSsbr ? খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন প্ৰথম পরিচ্ছেদ রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে,আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ, ছিপছিপে বালক । জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ । বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন -কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল । সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুনসেফিতে প্ৰবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তঁহার ভূত্য । তাহার আর-একটি মনিব বাড়িয়াছে। মােঠাকুরানী ঘরে আসিয়াছেন ; সুতরাং অনুকুলবাবুর উপর রাইচরণের পূর্বে যতটা অধিকার ছিল তাহার অধিকাংশই নূতন কত্রীর হস্তগত হইয়াছে । দিয়া অনেকটা পূরণ করিয়া দিয়াছেন । অনুকূলের একটি পুত্রসন্তান অল্পদিন হইল জন্মলাভ করিয়াছে, এবং রাইচরণ কেবল নিজের চেষ্টা ও অধ্যবসায়ে তাহাকে সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করিয়া লইয়াছে। তাহাকে এমনি উৎসাহের সহিত দোলাইতে আরম্ভ করিয়াছে, এমনি নিপুণতার সহিত তাহাকে দুই হাতে ধরিয়া আকাশে উৎক্ষিপ্ত করে, তাহার মুখের কাছে আসিয়া এমনি সশব্দে শিরশ্চিালনা করিতে থাকে, উত্তরের কোনো প্ৰত্যাশা না করিয়া এমন-সকল সম্পূর্ণ অর্থহীন অসংগত প্রশ্ন সুর করিয়া শিশুর প্রতি প্রয়োগ করিতে থাকে যে, এই ক্ষুদ্র আনুকীেলাবটি রাইচরণকে দেখিলে একেবারে পুলকিত হইয়া উঠে । অবশেষে ছেলেটি যখন হামাগুড়ি দিয়া অতি সাবধানে চৌকাঠ পার হইত এবং কেহ ধরিতে আসিলে খিল খিল হাস্যকলরব তুলিয়া দ্রুতবেগে নিরাপদ স্থানে লুকাইতে চেষ্টা করিত, তখন রাইচরণ তাহার অসাধারণ চতুর্য ও বিচারশক্তি দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া যাইত । মার কাছে গিয়া সগর্ব সবিস্ময়ে বলিত, “মা, তোমার ছেলে বড়ো হলে জজ হবে, পাঁচ হাজার টাকা রোজগার করবে।” পৃথিবীতে আর-কোনো মানবসন্তান যে এই বয়সে চৌকাঠ-লঙ্ঘন প্রভৃতি অসম্ভব চাতুর্যের পরিচয় দিতে পারে তাহা রাইচরণের ধ্যানের অগম্য, কেবল ভবিষ্যৎ জজেদের পক্ষে কিছুই আশ্চর্য নহে। অবশেষে শিশু যখন টলমল করিয়া চলিতে আরম্ভ করিল সে এক আশ্চর্য ব্যাপার- এবং যখন মাকে