পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৩৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


( δ \9 রবীন্দ্র-রচনাবলী দুরন্ত জলরাশি অস্ফুট কলভাষায় শিশুকে বার বার আপনাদের খেলাঘরে আহবান করিল। একবার ঝাপ করিয়া একটা শব্দ হইল, কিন্তু বর্ষার পদ্মাতীরে এমন শব্দ কত শোনা যায়। রাইচরণ আঁচল ভরিয়া কদম্বফুল তুলিল। গাছ হইতে নামিয়া সহাস্যমুখে গাড়ির কাছে আসিয়া দেখিল, কেহ নাই। চারি দিকে চাহিয়া দেখিল কোথাও কাহারও কোনো চিহ্ন নাই । মুহুর্তে রাইচরণের শরীরের রক্ত হিম হইয়া গেল। সমস্ত জগৎসংসার মলিন বিবৰ্ণ ধোওয়ার মতো হইয়া আসিল । ভাঙা বুকের মধ্য হইতে একবার প্রাণপণ চীৎকার করিয়া ডাকিয়া উঠিল, “বাবু- খোকাবাবুলক্ষ্মী দাদাবাবু আমার ।” কিন্তু চন্ন বলিয়া কেহ উত্তর দিল না, দুষ্টামি করিয়া কোনো শিশুর কণ্ঠ হাসিয়া উঠিল না ; কেবল পদ্মা পূর্ববৎ ছলছল খলখল করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল, যেন সে কিছুই জানে না এবং পৃথিবীর এই সকল সামান্য ঘটনায় মনোযোগ দিতে তাহার যেন এক মুহুর্ত সময় নাই । সন্ধ্যা হইয়া আসিলে উৎকণ্ঠিত জননী চারি দিকে লোক পঠাইয়া দিলেন । লণ্ঠন হাতে নদীতীরে লোক ভগ্নকণ্ঠে চীৎকার করিয়া বেড়াইতেছে । অবশেষে ঘরে ফিরিয়া রাইচরণ দাড়াম করিয়া মাঠকরুনের পায়ের কাছে আসিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল । তাহাকে যত জিজ্ঞাসা করে সে কাদিয়া বলে, “জানি নে মা ।” যদিও সকলেই মনে মনে বুঝিল পদ্মারই এই কাজ, তথাপি গ্রামের প্রান্তে যে এক দল বেদের সমাগম হইয়াছে তাহাদের প্রতিও সন্দেহ দূর হইল না। এবং মঠাকুরানীর মনে এমন সন্দেহ উপস্থিত হইল যে রাইচরণই বা চুরি করিয়াছে ; এমন-কি, তাহাকে ডাকিয়া অত্যন্ত অনুনয়পূর্বক বলিলেন, “তুই আমার বাছাকে ফিরিয়ে এনে দে— তুই যত টাকা চাস তোকে দেব।” শুনিয়া রাইচরণ কেবল কপালে করাঘাত করিল। গৃহিণী তাহাকে দূর করিয়া তাড়াইয়া দিলেন । অনুকুলবাবুর্তাহার স্ত্রীর মন হইতে রাইচরণের প্রতি এই অনায় সন্দেহ দূর করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন ; জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন রাইচরণ এমন জঘন্য কাজ কী উদ্দেশ্যে করিতে পারে । গৃহিণী বলিলেন, ‘কেন । তাহার গায়ে সোনার গহনা ছিল ।” দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ রাইচরণ দেশে ফিরিয়া গেল । এতকাল তাহার। সস্তানাদি হয় নাই, হইবার বিশেষ আশাও ছিল না । কিন্তু দৈবক্রমে, বৎসর না। যাইতেই, তাহার স্ত্রী অধিক বয়সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিয়া লোকলীলা সংবরণ कदिव्ज | এই নবজাত শিশুটির প্রতি রাইচরণের অত্যন্ত বিদ্বেষ জন্মিল । মনে করিল, এ যেন ছল করিয়া খোকাবাবুর স্থান অধিকার করিতে আসিয়াছে। মনে করিল, প্রভুর একমাত্র ছেলেটি জলে ভাসাইয়া নিজে পুত্ৰসুখ উপভোগ করা যেন একটি মহাপাতক । রাইচরণের বিধবা ভগ্নী যদি না থাকিত তবে এ শিশুটি পৃথিবীর বায়ু বেশিদিন ভোগ করিতে পাইত না । আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই ছেলেটিও কিছুদিন বাদে চৌকাঠ পার হইতে আরম্ভ করিল এবং সর্বপ্রকার নিষেধ লঙ্ঘন করিতে সকৌতুক চতুরতা প্ৰকাশ করিতে লাগিল । এমন-কি, ইহার কণ্ঠস্বর হাস্যক্ৰন্দনধ্বনি অনেকটা সেই শিশুরই মতো। এক-একদিন যখন ইহার কান্না শুনিত রাইচরণের বুকটা সহসা ধড়াসা করিয়া উঠিত, মনে হইত। দাদাবাবু রাইচরণকে হারাইয়া কোথায় কাদিতেছে। ফেলনা- রাইচরণের ভগ্নী ইহার নাম রাখিয়াছিল ফেলনা- যথাসময়ে পিসিকে পিসি বলিয়া ডাকিল । সেই পরিচিত ডাক শুনিয়া একদিন হঠাৎ রাইচরণের মনে হইল, “তবে তো খোকাবাবু আমার মায়া ছাড়িতে পারে নাই, সে তো আমার ঘরে আসিয়াই জন্মগ্রহণ করিয়াছে।’ এই বিশ্বাসের অনুকূলে কতকগুলি অকাট্য যুক্তি ছিল। প্রথমত, সে যাইবার অনতিবিলম্বেই ইহার জন্ম । দ্বিতীয়ত, এতকাল পরে সহসা যে তাহার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান জন্মে। এ কখনোই স্ত্রীর নিজগুণে হইতে পারে