পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৫১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ QQ汉 এবং দালিয়ার দিকে ফিরিয়া বিদ্ধ অন্তরে পরিহাসের ভান করিয়া কহিল, “রানী হইয়াই আমি প্রথমে তোমাকে রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়া অপরাধে শান্তি দিব । তার পরে আর যাহা করিতে হয় করিব ।” শুনিয়া দালিয়া বিশেষ কৌতুক বোধ করিল, যেন প্ৰস্তাবটা কার্যে পরিণত হইলে তাহার মধ্যে অনেকটা আমোদের বিষয় আছে । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ অশ্বারোহী পদাতিক নিশান হস্তী বাদ্য এবং আলোকে ধীবরের ঘর-দুয়ার ভাঙিয়া পড়িবার জো হইল । রাজপ্রাসাদ হইতে স্বর্ণমণ্ডিত দুই শিবিকা আসিয়াছে। আমিনা জুলিখার হাত হইতে ছুরিখানি লইল । তাহার হস্তিদন্তনির্মিত কারুকার্য অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিল । তাহার পর বসন উদঘাটন করিয়া নিজের বক্ষের উপর একবার ধার পরীক্ষা করিয়া দেখিল । জীবনমুকুলের বৃন্তের কাছে ছুরিটি একবার স্পর্শ করিল, আবার সেটি খাপের মধ্যে পুরিয়া বসনের মধ্যে লুকাইয়া রাখিল । একান্ত ইচ্ছা ছিল, এই মরণযাত্রার পূর্বে একবার দালিয়ার সহিত দেখা হয়, কিন্তু কাল হইতে সে নিরুদেশ । দালিয়া সেই- যে হাসিতেছিল। তাহার ভিতরে কি অভিমানের জ্বালা প্রচ্ছন্ন ছিল । শিবিকায় উঠিবার পূর্বে আমিনা তাহার বাল্যকালের আশ্রয়টি অশ্রুজিলের ভিতর হইতে একবার দেখিল— তাহার সেই ঘরের গাছ, তাহার সেই ঘরের নদী । ধীবরের হাত ধরিয়া ব্যাম্পরুদ্ধ কম্পিত স্বরে কহিল, “বুঢ়া, তবে চলিলাম। তিন্নি গেলে তোর ঘরকন্না কে দেখিবে ।” বুঢ়া একেবারে বালকের মতো কঁাদিয়া উঠিল । আমিনা কহিল, “বুঢ়া, যদি দালিয়া আর এখানে আসে তাহাকে এই আঙটি দিয়ো । বলিয়ো, তিন্নি যাইবার সময় দিয়া গেছে ।” এই বলিয়াই দ্রুত শিবিকায় উঠিয়া পড়িল । মহাসমারোহে শিবিকা চলিয়া গেল। আমিনার কুটির, নদীতীর, কৈলুতরুতল অন্ধকার, নিস্তব্ধ, জনশূন্য হইয়া গেল । যথাকলে শিবিকাদ্বয় তোরণদ্বার অতিক্রম করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল। দুই ভগ্নী শিবিকা ত্যাগ করিয়া বাহিরে আসিল । আমিনার মুখে হাসি নাই, চোখেও অশ্রুচিহ্ন নাই । জুলিখার মুখ বিবর্ণ। কর্তব্য যখন দূরে ছিল ততক্ষণ তাহার উৎসাহের তীব্ৰতা ছিল- এখন সে কম্পিতহীদয়ে ব্যাকুল মেহে আমিনাকে আলিঙ্গন করিয়া ধরিল { মনে মনে কহিল, “নব প্রেমের বৃন্ত হইতে ছিন্ন করিয়া এই ফুটন্ত ফুলটিকে কোন রক্তস্রোতে ভাসাইতে যাইতেছি । কিন্তু তখন আর ভাবিবার সময় নাই । পরিচারিকদের দ্বারা নীত হইয়া শত সহস্ৰ প্ৰদীপের অনিমেষ, তীব্ৰ দৃষ্টির মধ্য দিয়া দুই ভগিনী স্বপ্নাহতের মতো চলিতে লাগিল, অবশেষে বাসরঘরের দ্বারের কাছে মুহুর্তের জন্য থামিয়া আমিনা জুলিখাকে কহিল, "দিদি ৷” জুলিখা আমিনাকে গাঢ় আলিঙ্গনে বাধিয়া চুম্বন করিল। উভয়ে ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করিল। রাজবেশ পরিয়া ঘরের মাঝখানে মছলন্দা-শয্যার উপর রাজা বসিয়া আছে । আমিনা সসংকোচে দ্বারের অনতিদূরে দাড়াইয়া রহিল। জ্বলিখা অগ্রসর হইয়া রাজার নিকটবতী হইয়া দেখিল, রাজা নিঃশব্দে সকৌতুকে হাসিতেছেন। জুলিখা বলিয়া উঠিল “দালিয়া :- আমিনা মুছিত হইয়া পড়িল । দালিয়া উঠিয়া তাহাকে আহত পাখিটির মতো কোলে করিয়া তুলিয়া শয্যায় লইয়া গেল । আমিনা সচেতন হইয়া বুকের মধ্য হইতে ছুরিটি বাহির করিয়া দিদির মুখের দিকে চাহিল, দিদি দালিয়ার মুখের দিকে