পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৫৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ (VOC) অঙ্গুলিগুলি পৃথিবীর উপরে কেমন করিয়া পড়িতেছে এবং ভাবিতাম। এই পদক্ষেপ আমাদের নুতন-পরীক্ষাত্তীর্ণ ডাক্তারের কেমন লাগে ; মধ্যাহ্নে জানলার বাহিরে ঝাঝা করিত, কোথাও সাড়াশব্দ নাই, মাঝে মাঝে এক-একটা চিল অতিদূর আকাশে শব্দ করিয়া উড়িয়া যাইত ; এবং আমাদের উদ্যানপ্রাচীরের বাহিরে খেলেনাওয়ালা সুর ধরিয়া চাই খেলেন চাই চুড়ি চাই করিয়া ডাকিয়া যাইত, আমি একখানি ধবধবে চাদর পাতিয়া নিজের হাতে বিছানা করিয়া শয়ন করিতাম ; একখানি অনাবৃত বাহু কোমল বিছানার উপরে যেন অনাদরে মেলিয়া দিয়া ভাবিতাম, এই হাতখানি এমনি ভঙ্গিতে কে যেন দেখিতে পাইল, কে যেন দুইখানি হাত দিয়া তুলিয়া লইল, কে যেন ইহার আরক্ত করতলের উপর একটি চুম্বন রাখিয়া দিয়া আবার ধীরে ধীরে ফিরিয়া যাইতেছে - মনে করো এইখানেই গল্পটা যদি শেষ হয় তাহা হইলে কেমন হয় ।” আমি বলিলাম, মন্দ হয় না। একটু অসম্পূর্ণ থাকে বটে, কিন্তু সেইটুকু আপন মনে পূরণ করিয়া লইতে বাকি রাতটুকু বেশ কাটিয়া যায়।” “কিন্তু তাহা হইলে গল্পটা যে বড়ো গভীর হইয়া পড়ে। ইহার উপহাসটুকু থাকে কোথায় । ইহার ভিতরকার কঙ্কালটা তাহার সমস্ত দাত কাটি মেলিয়া দেখা দেয় কই । “তার পরে শোনো ! একটুখানি পিসাের হইতেই আমাদের বাড়ির এক তলায় ডাক্তার তাহার ডাক্তারখানা খুলিলেন। তখন আমি তাহাকে মাঝে মাঝে হাসিতে হাসিতে ঔষধের কথা, বিষের কথা, কী করিলে মানুষ সহজে মরে, এই সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতাম। ডাক্তারি কথায় ডাক্তারের মুখ খুলিয়া যাইত । শুনিয়া শুনিয়া মৃত্যু যেন পরিচিত ঘরের লোকের মতো হইয়া গেল। ভালোবাসা এবং মরণ কেবল এই দুটােকেই পৃথিবীময় দেখিলাম । “আমার গল্প প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে- আর বড়ো বাকি নাই।' আমি মৃদুস্বরে বলিলাম, “রাত্রিও প্রায় শেষ হইয়া আসিল ।” “কিছুদিন হইতে দেখিলাম ডাক্তারবাবু বড়ো অন্যমনস্ক এবং আমার কাছে যেন ভারি অপ্ৰতিভ । একদিন দেখিলাম। তিনি কিছু বেশিরকম সাজসজ্জা করিয়া দাদার কাছে তাহার জুড়ি ধার লাইলেন, রাত্রে কোথায় যাইবেন । “আমি আর থাকিতে পারিলাম না। দাদার কাছে গিয়া নানা কথার পর জিজ্ঞাসা, করিলাম, হঁহা দাদা, ডাক্তারবাবু আজ জুড়ি লইয়া কোথায় যাইতেছেন। “সংক্ষেপে দাদা বলিলেন, মরিতে । SBDB DDDuDDS DDS DBB DBBBB BDBDD S “তিনি পূর্বাপেক্ষা কিঞ্চিৎ খোলসা করিয়া বলিলেন, বিবাহ করিতে। “আমি বলিলাম সত্য নাকি ।- বলিয়া অনেক হাসিতে লাগিলাম । “অল্পে অল্পে শুনিলাম। এই বিবাহে ডাক্তার বারো হাজার টাকা পাইবেন । “কিন্তু আমার কাছে। এ সংবাদ গোপন করিয়া আমাকে অপমান করিবার তাৎপৰ্য্য কী । আমি কি তাহার পায়ে ধরিয়া বলিয়াছিলাম যে, এমন কাজ করিলে আমি বুক ফাটিয়া মরিব । পুরুষদের বিশ্বাস করিবার জো নাই। পৃথিবীতে আমি একটিমাত্র পুরুষ দেখিয়াছি এবং এক মুহুর্তে সমস্ত জ্ঞান লাভ করিয়াছি। ‘ডাক্তার রোগী দেখিয়া সন্ধ্যার পূর্বে ঘরে আসিলে আমি প্রচুর পরিমাণে হাসিতে হাসিতে বলিলাম, কী ডাক্তার মহাশয় । আজ নাকি আপনার বিবাহ ? “আমার প্রফুল্লতা দেখিয়া ডাক্তার যে কেবল অপ্রতিভ হইলেন তাহা নহে, ভারি বিমর্ষ হইয়া গেলেন । “জিজ্ঞাসা করিলাম, বাজনা-বাদ্য কিছু নাই যে ? ‘শুনিয়া তিনি ঈষৎ একটু নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, বিবাহ ব্যাপারটা কি এতই আনন্দের । ‘শুনিয়া আমি হাসিয়া অস্থির হইয়া গেলাম। এমন কথাও তো কখনো শুনি নাই। আমি বলিলাম, সে হইবে না, বাজনা চাই, আলো চাই । "দাদাকে এমনি ব্যস্ত করিয়া তুলিলাম যে দাদা তখনই রীতিমত উৎসবের আয়োজনে প্রবৃত্ত হইলেন । “আমি কেবলই গল্প করিতে লাগিলাম বধু ঘরে আসিলে কী হইবে, কী করিব । জিজ্ঞাসা করিলাম